বুড়িগঙ্গার তীরের পরিত্যক্ত ডকইয়ার্ডটি যেন এক অতিকায় পশুর কঙ্কাল। চারপাশের থমথমে বাতাসে পোড়া লোহা, পচা নোনা জল আর আর্দ্রতার এক ভ্যাপসা গন্ধ মিশে আছে। ৯৯তম পৃথিবীর এই ঢাকা শহরের আকাশটা আজ রাতে অস্বাভাবিক রকমের ভারী। মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢাকা পড়ে থাকলেও দূর দিগন্তের বিশালকায় টাওয়ারগুলোর লাল আর নীল নিয়ন সাইনের আলো কুয়াশায় চুইয়ে পড়ছে। সেই ম্লান আলোয় জং ধরা ক্রেনগুলোকে মনে হচ্ছে এক একটি নিথর প্রেতাত্মা।
ডকইয়ার্ডের মাঝখানে একটি মাত্র হ্যালোজেন ল্যাম্প টিমটিম করে জ্বলছে। তার হলদেটে আলোয় চারপাশের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। মাফিয়া ডন 'কালা জাহাঙ্গীরের' পায়ের নিচে পড়ে আছে সাংবাদিক ইশতিয়াক। ইশতিয়াকের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ এই জনশূন্য প্রান্তরে অস্বাভাবিক রকমের জোরে শোনা যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরের হাতের জ্বলন্ত সিগারেট থেকে ওঠা ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে মিশে যাচ্ছে ওপরের নিকষ অন্ধকারে। তার চাহনিতে কোনো আবেগ নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত শীতলতা।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির হাতে একটি কেরোসিনের ড্রাম। তরলটি যখন ইশতিয়াকের শরীরের চারপাশের মেঝেতে চুইয়ে পড়তে শুরু করল, তখন বাতাসের সেই ভ্যাপসা গন্ধে কেরোসিনের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ যোগ হলো। ইশতিয়াক একবার চিৎকার করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মুখ বাঁধা কাপড়টি কেবলই তার গোঙানিকে গিলে ফেলল।
জাহাঙ্গীর নিচু হয়ে সিগারেটের ছাইটুকু ইশতিয়াকের ওপর ঝেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "শহরের নোংরা ঘাঁটাঘাঁটি করার শখ তো অনেক হলো ছোকরা। আজ রাতে সেই নোংরাতেই তুই ছাই হবি।"
ঠিক তখনই মাথার ওপরের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। কোনো চিৎকার নয়, কোনো হুংকার নয়—শোনা গেল কেবল বাতাসের বুক চিরে দেওয়া এক তীব্র তীক্ষ্ণ শব্দ। মনে হলো বিশাল কোনো ধাতব চাকা প্রচণ্ড বেগে ঘুরছে। মুহূর্তের জন্য ওপরের আকাশে একটা ছায়া বিদ্যুৎ চমকের মতো খেলে গেল। হ্যালোজেন বাতিটা একবার কেঁপে উঠে দপদপ করতে লাগল।
বাতাসের চাপ হঠাৎ করেই বেড়ে গেল। জাহাঙ্গীরের লোকেরা ভয়ার্ত চোখে ওপরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। সেই নিকষ কালো আকাশ থেকে ডকইয়ার্ডের জং ধরা মেঝের দিকে আছড়ে পড়ছে এক অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ। ক্ল্যাংক-হিস-ক্ল্যাংক। হাইড্রোলিকের ওঠানামার শব্দের সাথে ভারী মেটাল পাতের ঘর্ষণে বের হওয়া এক গম্ভীর প্রতিধ্বনি পুরো ডকইয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ল।
অন্ধকারের সেই পর্দা ছিঁড়ে নিচে নেমে এল সে। বাজের মেটাল পাখনার প্রতিটি জয়েন্ট থেকে হালকা নীলচে ধোঁয়া সশব্দে বেরিয়ে আসছে। মাটিতে পা রাখামাত্র একটি ধাতব কম্পন ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। পাখনার ধারালো ব্লেডগুলো নিয়ন আলোর সামান্য ছোঁয়ায় হীরের মতো জ্বলে উঠল। বাজ সরাসরি তাকাচ্ছে না, কিন্তু তার নিথর দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটাই এক বীভৎস সংকেত দিচ্ছে। তার যান্ত্রিক ডানার একটি ডানা সামান্য নড়ে উঠতেই বাতাসের ঝাপটা মাফিয়াদের মুখে থাপ্পড়ের মতো লাগল।
সেখানে এখন কোনো কথা নেই, কেবল পাখনার ধীর লয়ের ধাতব গুঞ্জন বাতাসের স্তব্ধতাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
বুড়িগঙ্গার তীরের সেই নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই এক যান্ত্রিক তাণ্ডবে রূপান্তরিত হলো। জাহাঙ্গীরের এক লোক চিৎকার করে তার সাব-মেশিনগান তাক করতেই বাজের পিঠের বিশাল মেটাল পাখনার বাম পাশটা এক অবিশ্বাস্য গতিতে সশব্দে খুলে গেল। 'ক্ল্যাক-হিস!'—হাইড্রোলিক পিস্টনের প্রচণ্ড চাপে বাতাসের বুক চিরে মেটাল ব্লেডগুলো একটি অর্ধবৃত্তাকার ঢাল তৈরি করল। বুলেটের ঝঁাক সেই ধাতব আবরণে আঘাত করে আগুনের ফুলকি আর স্ফুলিঙ্গ ছিটকে দিচ্ছিল, কিন্তু বাজের শরীরের একটি রোমও স্পর্শ করতে পারল না।
ঢালের আড়াল থেকেই বাজ তার ডান দিকের পাখনার একটি উইং-ব্লেডকে প্রজেক্টাইল হিসেবে ব্যবহার করল। তীক্ষ্ণ একটি যান্ত্রিক শিস দিয়ে পাখনার প্রান্ত থেকে একটা কার্বন-স্টিল শার্ট ছিটকে গিয়ে বন্দুকধারী লোকটির কবজি বিদীর্ণ করে দিল। বন্দুকটি ছিটকে পড়ার আগেই বাজ তার ডানার ঝাপটায় মাটি থেকে কয়েক ফুট উপরে শূন্যে ভেসে উঠল। তার যান্ত্রিক ডানার প্রান্ত থেকে নীলচে শিখা বেরোচ্ছে, যা অন্ধকারের বুক চিরে এক ভৌতিক অবয়ব তৈরি করেছে।
বাকি তিনজন আতঙ্কে পিছু হটতে হটতে এলোপাথাড়ি গুলি শুরু করল। বাজ এবার রক্ষণভাগ ছেড়ে আক্রমণে গেল। সে তার বিশাল পাখনার জোড়া ডানা দিয়ে নিজের শরীরকে গোল করে ঘুরিয়ে একটি ধাতব ঘূর্ণিঝড়ের মতো আছড়ে পড়ল তাদের ওপর। পাখনার ধারালো ব্লেডগুলো যখন বাতাসের সাথে ঘর্ষণ খাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল কোনো বিশাল করাত কল সশব্দে চলছে। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে দুজন লোক সেই ধাতব ঝাপটায় রক্তাক্ত হয়ে ডকইয়ার্ডের জং ধরা কন্টেইনারের গায়ে ছিটকে পড়ল। কন্টেইনারের গায়ে তাদের শরীরের আঘাতে যে বিকট শব্দ হলো, তা বুড়িগঙ্গার ওপারেও হয়তো প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
জাহাঙ্গীর এবার তার কোমরে গোঁজা পিস্তল বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু বাজের ক্ষিপ্রতা ছিল মানুষের কল্পনার বাইরে। বাজ তার পিঠের পাখনার মেকানিজম ব্যবহার করে বুস্ট নিয়ে সেকেন্ডের মধ্যে জাহাঙ্গীরের সামনে এসে দাঁড়াল। বাজের বাঁ দিকের পাখনার একটি অংশ সাপের মতো প্রসারিত হয়ে জাহাঙ্গীরের হাতটি চেপে ধরল। যান্ত্রিক সেই চাপের তীব্রতায় হাড় মড়মড় করে ভাঙার শব্দ ইশতিয়াকের কানেও পৌঁছাল।
জাহাঙ্গীরের চিৎকার করার সুযোগটুকুও বাজ দিল না। সে তার ডান হাতের কবজিতে থাকা একটি ছোট ইলেকট্রিক ট্রিগার অন করতেই তার পাখনার প্রতিটি জয়েন্ট থেকে উচ্চ ভোল্টেজের নীল বিদ্যুৎ খেলা করতে শুরু করল। পুরো ডকইয়ার্ড এখন বাজের পাখনার যান্ত্রিক গর্জন আর বিদ্যুতের কড়কড়ানিতে কাঁপছে। বাজের মেটাল উইংসের একটি ঝাপটায় জাহাঙ্গীরকে শূন্যে তুলে আছাড় মারল সে। তার পাখনার ব্লেডগুলো যখন সংকুচিত হয়ে আবার পিঠের সাথে লেপ্টে গেল, তখন চারপাশ আবার নিথর। কেবল নিভে আসা আগুনের চটচট শব্দ আর মাটিতে পড়ে থাকা মাফিয়াদের গোঙানি শোনা যাচ্ছিল।
বাজের প্রতিটি নিশ্বাস এখন তার হেলমেটের যান্ত্রিক ফিল্টারের ভেতর দিয়ে এক গম্ভীর ছন্দে বেরিয়ে আসছে। তার রক্তমাখা ধাতব পাখনাগুলো থেকে টপটপ করে বিষাক্ত তেলের সাথে মিশে থাকা রক্ত ঝরছে মেঝেতে।
মাটির ওপর পড়ে থাকা কালা জাহাঙ্গীরের শরীরের ওপর বাজের বিশাল মেটাল পাখনার ছায়াটা প্রলম্বিত হয়ে আছে। জাহাঙ্গীরের ভাঙা কবজি থেকে রক্ত চুইয়ে কেরোসিনের সাথে মিশছে। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া জাহাঙ্গীর দাঁতে দাঁত চেপে একবার বাজের চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। বাজের হেলমেটের ফাটল দিয়ে বের হওয়া নীলচে আভা তার মুখকে এক যান্ত্রিক দানবের রূপ দিয়েছে।
"কে... তুই?" জাহাঙ্গীর টেনে টেনে শব্দগুলো উচ্চারণ করল। "রাতের প্রহরী তোকে পাঠিয়েছে? সে কি মনে করে এই ঢাকা শহর সে তার পোষা পাখি দিয়ে শাসন করবে?"
বাজ কোনো উত্তর দিল না। তার পিঠের ডানাগুলো একবার যান্ত্রিক শব্দে কেঁপে উঠল, যেন কোনো শিকারি বিড়াল তার থাবা গুটিয়ে নিচ্ছে। সে নিচু হয়ে জাহাঙ্গীরের গলার কাছে তার পাখনার একটা ধারালো ব্লেড সশব্দে চেপে ধরল। ব্লেডের শীতল স্পর্শে জাহাঙ্গীরের গলার চামড়া কেটে এক বিন্দু রক্ত বেরিয়ে এল।
"প্রহরী কেবল শাসন করতে চায়," বাজের কণ্ঠস্বর কোনো মানুষের মতো শোনাল না; তা ছিল একাধিক মেটাল ফ্রিকোয়েন্সির মিশ্রণে তৈরি এক গম্ভীর যান্ত্রিক প্রতিধ্বনি। "আমি মুছতে চাই।"
জাহাঙ্গীর একটা বীভৎস হাসি দেওয়ার চেষ্টা করে থুতু ফেলল মাটিতে। "মুছবি? এই শহর তোকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। আমাদের পেছনে কারা আছে জানিস? ওপর তলার সেই লোকগুলো যখন ড্রাগের নেশায় এই শহরটাকে নরক বানাবে, তখন তোর এই ভাঙা ডানা দিয়ে তুই কতজনকে বাঁচাবি?"
বাজের পাখনার পিস্টনগুলো এক অদ্ভুত ছন্দে ওঠানামা করতে শুরু করল। সে জাহাঙ্গীরের মুখের আরও কাছে এগিয়ে এল। "আমি বাঁচাতে আসিনি জাহাঙ্গীর। আমি শুধু আবর্জনা সরাতে এসেছি।"
সে একটু থামল, তারপর তার পাখনার ব্লেডটা আরও গভীরে চেপে ধরল। "তোর বসকে গিয়ে বলিস, ৯৯তম পৃথিবীর অন্ধকার এখন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। রাতের অন্ধকার ঢাকা এখন তার নয়, রাত এখন শিকারির। রা্ত এখন বাজ-এর!"
ইশতিয়াক পাশ থেকে অস্ফুট স্বরে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। বাজ তার দিকে না তাকিয়েই ডানা দিয়ে ইশতিয়াকের হাতের বাঁধন এক নিমিষেই কেটে ফেলল। কিন্তু তার দৃষ্টি তখনো জাহাঙ্গীরের ভয়ার্ত চোখের ওপর স্থির।
"তোর জীবনের আয়ু এই আগুনের শিখাটুকু নিভে যাওয়া পর্যন্ত," বাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তার ডানা দুটোকে বিশালভাবে প্রসারিত করল। "পরের বার যখন দেখা হবে, তখন আমি কথা বলব না। শুধু আমার ডানা কথা বলবে।"
এক মুহূর্তের জন্য ডকইয়ার্ডের বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপরই এক প্রচণ্ড বায়ুচাপ তৈরি করে বাজ আকাশের দিকে ডাইভ দিল। তার পাখনার যান্ত্রিক শিস আর বাতাসের গর্জনে জাহাঙ্গীরের শেষ চিৎকারটুকুও চাপা পড়ে গেল।
