Metro-মেট্রো || A halloween 2025 story || মুহাম্মদ রাগিব নিযাম -Muhammed Ragib Nizam

 

এক.


মিরপুর মেট্রো ষ্টেশনের আজ দশ বছর হতে চললো। অনেক পুরো স্টেশন। পুরনো মেট্রো স্টেশনটি আজ রাতে একেবারে নিস্তব্ধ। শহরের ব্যস্ততা এবং হট্টগোলের মাঝে এটি যেন একটি অন্ধকার গুহার মতো। শেষ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে কেবল কিছু মানুষ, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ক্লান্ত এবং উদ্বিগ্ন। রাতের গভীরতা যেন তাদের মধ্যে এক ভয়াবহ অনুভূতি তৈরি করছে। বাতির আলো ঝাপসা হলো,ে এসেছে, আর সবকিছু অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়লোছে। 

ট্রেন আসতে কিছু সময় বাকি, কিন্তু স্টেশনটি একদম শূন্য মনে হচ্ছে। দূরে কোথাও একটি ঝিরঝিরে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, যেন কিছু অদৃশ্য সত্তা সেখানে মিশে আছে। সানভি, ক্রিমিনোলজি পড়ছে ব্র‍্যাকে , মেট্রো স্টেশনটি পর্যবেক্ষণ করতে এসেছিল। তার পরিকল্পনা ছিল কিছু তথ্য সংগ্রহ করা—কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, এখানে কিছু অস্বাভাবিক হচ্ছে। ক্লাস থেকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হলো,েছিলো “ধর্ষণের প্রতিকার” বিষয়ে লিখতে। এই স্টেশনে এমনই এক ঘটনা ঘটেছিলো।

টুকটাক কিছু যাত্রী উঠলো। রেলগাড়িটা চলতে শুরু করেছে। এমন সময় ধুপ করে ছাদের উপর বাড়ি খেলো কি যেনো। যাত্রীদের মধ্যে দুইজন যুবক ভয় পেয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। একজন বললো, “তুমি কি শুনেছ আওয়াজটা? বাইরে কি কালো অন্ধকার। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের দিকে দেখছে।” অন্যজন উত্তর দেয়, “হলোতো আমরা বেশি ভয় পাচ্ছি। পুরনো স্টেশন, স্বাভাবিক ভাবেই ভুতুড়ে মনে হচ্ছে।” 

তারা স্পষ্টত ভীত এখন, সানভি তাদের দিকে একবার তাকালো,, আরেকবার ছাদের দিকে। তার মনে হলো, এই অন্ধকার এবং নিস্তব্ধতা তাদের মধ্যে কিছু ভয়ঙ্কর অনুভূতি তৈরি করছে। সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই তার মনে শান্তি আসছে না। হঠাৎ, একটি মৃদু আওয়াজ তার কানের কাছে এসে লাগে, যেন কেউ ডাকছে। 

“হাউউউ”

সে চমকে উঠলো চারপাশে তাকালো,, কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না।

রাতের শীতল হাওয়া তার শরীরকে স্পর্শ করলো। সানভির পেছনে একটি সাদা কাপড়লো মোড়া একটি ছায়া নড়ে উঠলো। সে ফিরে তাকালো, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলো না। তার হৃদস্পন্দন তীব্র হয়ে উঠলো। যতক্ষণ না ট্রেন আসে, সে স্থির দাঁড়িয়ে থাকলো। 

আসলে, রাত যত গভীর হলো, ভয়ের আবহ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। পুরনো মেট্রো স্টেশনটির দেওয়ালগুলো যেন অনেক গোপন ইতিহাস বহন করছে। 

এমন সময় বিকট একটা তিরিক্ষি আওয়াজ হলো। মানে ট্রেন থেমে গেলো। ট্রেনের পেছন দিক থেকে, কেউ কেউ বিস্ময়ে চোখ গোল করে কানে হাত দিলো। অন্যান্য যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। একজন পুরুষ হঠাৎ অচেতন হয়ে মাটিতে পড়লো গেলো, তার মুখ থেকে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। অন্য যাত্রীরা ভয়ে চিৎকার শুরু করে দিলো। 

“শুধু এখানেই নয়, তুমি এই স্টেশনে থাকলে নিরাপদে বের হওয়া যাবে না,” একটি কণ্ঠস্বর বললো, উঠলো। সানভির কানে পৌঁছাতে গায়ে শিহরণ বয়ে গেলো।

সানভি পেছনে তাকিয়ে দেখে, তার আশেপাশের যাত্রীরা পালাতে চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে হাহাকার। কিছু মানুষের মুখ থেকে কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আর কিছু লোক অসুস্থ হলো,ে পড়ছে। সে বুঝতে পারে, এই পুরনো স্টেশনের ইতিহাসে ভয়ংকর কিছু অন্ধকার লুকিয়ে আছে।

করিডর ধরে একেবারে শেষ বগিতে যাওয়ার চেষ্টা করলো সানভি। ওপাশ থেকে আজকের দিনের শেষ ট্রেনকে মিরপুরের দিকে যেতে দেখলো। এই বগিতে হঠাৎ সে দেখলো মানুষ নেই। শেষ ট্রেনের আওয়াজ ভেসে আসার আগেই সানভি জানালার দিকে তাকালো। দেখলো দূর থেকে বাতাসে ভেসে একটি কালো ছায়া তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার মনের মধ্যে অজানা ভয় কাজ করছে এখন। কেন জানি, সে জানে—এখন তাকে কিছু একটা করতে হবে। যদি না করে, সে এই রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।

দৌড়ে আগের বগিতে চলে এলো। যাত্রীরা একে একে আতঙ্কিত হলো,ে পড়ছে। পুরুষদের মধ্যে বিশেষভাবে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। একজন মধ্যবয়সী পুরুষের হাতে তার ফোন কাঁপছে। সে বারবার ফোনের স্ক্রীনে তাকাচ্ছে, যেন কোন সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, সেই দুই যুবক পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের মুখের চেহারা এতটাই চিন্তিত যে কথাগুলো বের হচ্ছে না। 

একজন বৃদ্ধ, যার চোখে ভয়ের একটা আভাস দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ করে মেঝেতে পড়লো গেলো। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে, মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। আশেপাশের লোকজন আতঙ্কে চিৎকার শুরু করে দিলো। কিছু পুরুষ হঠাৎ করে নীরবে মেঝেতে পড়লো যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ যেন অচেতন হয়ে পড়ছে, আবার কেউ কেউ দ্রুত পালানোর চেষ্টা করছে। 

এমন পরিস্থিতিতে, সানভি তার চারপাশে তাকালো, এবং দেখে, পুরুষদের চোখে এক আতঙ্কিত বিভীষিকা। তাদের হাঁটু ভেঙে যাচ্ছে, একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছে। এই দৃশ্য তার মনে একটি অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছে—শহরের পুরনো মেট্রো স্টেশনটির মধ্যে কিছু অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে, যা তাদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

স্টেশনটিতে আতঙ্কের চাদর নেমে আসছে যেনো। কয়েকজন যাত্রী ভয়ে অচেতন হলো,ে পড়ছে। এক যুবক, যার মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট, হঠাৎ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো। তার পাশের একজন দ্রুত সাহায্য করার চেষ্টা করে, কিন্তু তার সাথেও এমনটি ঘটতে শুরু করলো। সে নিজেও অসুস্থ হলো,ে পড়লো। 

কিছুক্ষণ পর, স্টেশনের কিছু যাত্রী টের পেলো, তাদের অনেকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে। একজন মহিলা তাঁর হাতে হাত জড়িয়ে ধরে বসে আছে। তার রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি, যিনি হলোতো জীবনভর এই মেট্রো স্টেশনে যাতায়াত করেছেন, তিনি অদৃশ্য আতঙ্কে হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা বসলেন। 

যাত্রীরা চিৎকার করছে, এবং চারপাশে একটি হাহাকার তৈরি হচ্ছে। স্টেশন কর্তৃপক্ষ জরুরি সেবার জন্য ফোন করতে চেষ্টা করছে, কিন্তু ফোনের সিগন্যাল কোথাও পাচ্ছে না। একজন নার্স, যিনি স্টেশনের কাছে একটি ক্লিনিকে কাজ করেন, তার সাহায্য নিয়ে আসে। কিন্তু সেই নার্সও আতঙ্কিত হলো,ে পড়লো। 

এদিকে, অচেতন হওয়া যাত্রীদের মধ্যে একটি ছোট মেয়ে ভয় পেয়ে চিৎকার করতে থাকলো। সে তার মাকে খুঁজছে, কিন্তু মা নিখোঁজ। সবকিছু যেন একটি ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। 

হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত স্টেশনের দিকে আসছে। যাত্রীরা একে অপরকে শক্ত করে ধরে আছে, কিন্তু কারোর মুখে আর কোনো আশা নেই। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে কিছু যাত্রী অচেতন হয়ে পড়ছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ হলো,তো আর কখনো ফিরে আসবে না।

রাতের শেষ ট্রেনটি স্টেশনে প্রবেশ করলো। আগের ট্রেন থেকে নেমে সেখানে যাত্রীরা দ্রুত উঠলো পড়লো। শেষ বগিতে, সানভি একটি কোণায় বসে আছে। চারপাশে আতঙ্কের পরিবেশ। দুই যুবক পাশের আসনে বসে কাঁপছে। এক যুবক বলতে থাকলো, “মনে হচ্ছে, এখানে কিছু ভুল হচ্ছে। অনেক যাত্রী যে আসছে, তারা ফিরে যাচ্ছে না। কি হচ্ছে?”

আরেকজন উত্তর দেয়, “আমি জানি না, কিন্তু আমি এই স্টেশনে আর দাঁড়াতে পারছি না। বরং, সোজা বাড়ি চলে যাই। এইরকম পরিস্থিতি আমার কাছে ভালো ঠেকছে না। আজকে এতো বছর যাতায়াত করি।”

সানভি তাদের কথোপকথন শুনে ভাবতে শুরু করলো। সে জানে, শেষ ট্রেনের আগের ঘটনাগুলো নিয়ে কিছু একটা গণ্ডগোল চলছে। কয়েকজন যাত্রী ইতিমধ্যে নিখোঁজ হয়েছে। তার মনে হলো, এর পেছনে কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে।

একটা হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটি চলতে শুরু করলো। ঠিক তখনই, ট্রেনটি একটি অদ্ভুত শব্দ করে থেমে গেলো। সানভির মনে হলো, কিছু একটা হয়েছে। অন্য যাত্রীদের মধ্যে হাহাকার শুরু হয়ে গেলো। “কী হচ্ছে?” একজন নারী চিৎকার করে ওঠে। “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”

সানভি উঠলো দাঁড়িয়ে জানালার দিকে তাকালো,। অন্ধকারে সে দেখতে পায়, কিছু যাত্রী হঠাৎ করে ট্রেন থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ ফিরে আসছে না। 

“তোমরা কি দেখেছ? কিছু লোক ট্রেন থেকে বের হলো,ে গেলো! শুনলাম ট্রেনে কি একটা ঢুকছে” সানভি বললো। যুবকরা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। 

“তোমার কি পাগল হয়ে গেছে? ওভাবে বলতে নেই। বাইরে কি দেখছ? ভেতরে তাকাও” একজন বললো।

সানভি আরও জোরালোভাবে বললো,, “না, আমি নিশ্চিত। ওরা কোথায় যাচ্ছে?” 

ঠিক তখন, ট্রেনের লাইটগুলো ঝলকানো শুরু করলো। একের পর এক পুরুষ যাত্রী স্টেশন থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। চার হাত পায়ে ভর করে কুকুরের মতন হেঁটে কি যেনো অবিশ্বাস্য গতি তে এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে। চিৎকার শুরু হলো,ে গেলো বগির ভেতর কয়েকজন যাত্রী হতাশায় কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। 

স্টেশন কর্তৃপক্ষ ট্রেনের ইঞ্জিন মাস্টারের সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো সাড়া মেলছে না। একজন কর্মচারী বললো,ন, “কিছুই হচ্ছে না। আমরা এই ঘটনা নিয়ে চিন্তা করব না। রাত গভীর, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।” পরিস্থিতি

সানভির মনে উদ্বেগ তৈরি হযলো। “কিন্তু লোকগুলো কোথায় গেল? আপনারা এভাবে চুপ মেরে বসে আছেন কেন?” সে তাগিদ দিয়ে বললো,।

“এটা আমাদের কাজ নয়,” কর্মচারীটি নিরুৎসাহিতভাবে উত্তর দিলো। একেবারেই নিলিপ্ত উত্তর।

সানভির মনে হচ্ছে, এই ঘটনাগুলো মেট্রো স্টেশনের অন্ধকার ইতিহাসের অংশ। এক অদৃশ্য শক্তি তার চারপাশে কাজ করছে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে এই রহস্যের সমাধান করতে হবে—নইলে হলো,তো সে নিজেও কখনো ফিরতে পারবে না।


দুই.


সানভিসহ বেশ কয়জন উদ্যোগ নিয়ে সব যাত্রীকে বের করে নিরাপদে স্টেশনের বাইরে নিয়ে গেলো। সবাই বিকল্প উপায়ে বাড়ি ফিরে গেলো। ঘরে ফিরে সানভি প্রথমে চেক করলো নিউজ। না! টিভিতে মিরপুর মেট্রোরেল স্টেশন নামে কিছুই নিউজ হলো,নি! তাহলে এতোগুলো মানুষ গায়েব হলো,ে গেলো তাড়াতাড়ি? আর ঐযে যাত্রী সংখ্যা! সে ঢোকার সময় দেখেছিলো ১০২জন। বের হলো,েছেও সমপরিমাণে। তার সহযোগী যারা ছিলো তাদের সবাই ও গুণতে ভুল করেনি।

তাহলে ফেনা, অ্যাম্বুলেন্স। কি এসব?! মাথায় ঢুকছে না। যা জানার কাল জানা যাবে। এখন ঘুমাতে হবে।

রাত গভীর হতে থাকলো, আর সেই সময় শেষ ট্রেনটি স্টেশনে ঢুকলো। ভেতরে খুব বেশি যাত্রী নেই। সবাই ক্লান্ত মুখে নিজেদের ভাবনায় মগ্ন। হঠাৎ, ট্রেনের আলো কয়েকবার টিমটিম করে ওঠে। যাত্রীরা অস্বস্তিতে কাঁপছে, কেউ কেউ আতঙ্কে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। ট্রেনের ঝুলানো লাইটগুলো তখনও দুলছে, যেন সেগুলোও কিছু বলতে চাইছে।

কোনো এক মুহূর্তে, এক যুবক হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো, “ওই দেখো! ওই জানালার পাশে মুখটা!” তার চিৎকারে সবাই চমকে উঠলো। সবার চোখ চলে গেলো জানালার দিকে। কালো কাচের ওপারে একটি মুখাবয়ব হঠাৎ দেখা দেয়, তার চেহারা অদ্ভুত, যেন মানুষের মতো কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। সেই মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, ফাঁকা চোখ আর ঠাণ্ডা দৃষ্টি নিয়ে সে তাকিয়ে আছে ট্রেনের ভেতরের দিকে। 

মুখটি ধীরে ধীরে ট্রেনের জানালার পাশ দিয়ে মিশে যেতে থাকলো, কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য পুরো বগির ভেতর চুপচাপ হলো,ে যায়। ভেতরে থাকা কয়েকজন যাত্রী স্তব্ধ হলো,ে সেদিকে তাকিয়ে থাকলো, যেন তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না কী দেখছে। একজন মহিলা ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে, তার ঠোঁট কাঁপছে, হাত জড়ো করে মুখে লাগিয়ে কিছু প্রার্থনা করছে। আরেকজন বৃদ্ধ ট্রেনের দরজা ধরে দাঁড়িয়েছিল, সে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়লো।

এদিকে, সানভি সেই ট্রেনে ছিল না, কিন্তু সে আগের থেকেই শেষ ট্রেনের বগিতে তার অডিও রেকর্ডার সেট করে রেখেছিল। আগের রাতে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনাগুলো তাকে সন্দেহে ফেলেছিল। তাই সবার অজান্তে সে এই ব্যবস্থা করেছিল, যদি কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করা গেলো। রেকর্ডারের মাইক্রোফোন পুরো বগির শব্দ ধরা শুরু করে, যাত্রীদের শ্বাস-প্রশ্বাস, কান্না, কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে কথা বলছে—“ওটা কি ছিল?” “তুমি দেখেছ?” “আমার মনে হলো, না, আমি আর মেট্রোতে উঠবো।”

মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাটি আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে শুরু করলো। ট্রেনের আলো আবারো বন্ধ হলো,ে গেলো, চারদিকে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে। কারো দম বন্ধ হলো,ে আসে, কেউ দিশেহারা হলো,ে চারপাশে তাকাচ্ছে, আর কেউ চিৎকার করে বলছে, “আমাদের কেউ বাঁচাও!”

সানভি তার বাসায় সেই রেকর্ডিং সরাসরি শোনার পাশাপাশি সেটি ফেসবুক লাইভে চালু করে দেয়। সবাই তার রেকর্ড করা আওয়াজ শুনতে পায়। লাইভে অনেকেই কমেন্টে লিখতে থাকলো, “এটা কি সত্যি?”, “ওটা কি ভূত?”, “মেট্রো স্টেশনে আবার কী হচ্ছে?”

ততক্ষণে ট্রেনটি অদ্ভুতভাবে থেমে গেলো, তবে ভেতরের আতঙ্ক যেন শেষ হতে চাচ্ছে না।

ট্রেনটি হঠাৎ করে থেমে যায়, আর সাথে সাথেই যাত্রীরা আরও আতঙ্কিত হলো,ে পড়লো। কেউ বুঝতে পারে না, ট্রেন কেন এই নির্জন জায়গায় থেমে গেল। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক, কেউ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে, কেউ ভেতরের অন্ধকারে নিজের জায়গায় চুপ করে বসে আছে। 

এমন সময় এক মধ্যবয়সী পুরুষ চিৎকার করে বললো, ওঠে, “একজন যাত্রী নেই! আমি দেখছিলাম, সে এখানেই বসে ছিল, কিন্তু এখন কোথাও নেই!” কথাটা শুনে পুরো বগির ভেতর হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। সবাই সেই খালি আসনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেখানে ওই ব্যক্তি কিছুক্ষণ আগেও বসে ছিল। কেউ কেউ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলতে থাকলো, “এটা কী হচ্ছে?” “মানুষ অদৃশ্য হলো,ে যাচ্ছে?”

এদিকে, সানভির অডিও সেটআপ থেকে সমস্ত শব্দ সরাসরি ফেসবুক লাইভে প্রচারিত হচ্ছে। তার রেকর্ডার যাত্রীদের ভয়ের সুর, তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক সবকিছু ধরে রেখেছে। লাইভে বহু মানুষ দেখছে এই ঘটনাগুলো, কমেন্টের পর কমেন্ট ভেসে আসছে, কেউ বলছে “এটা কি ভৌতিক কিছু?”, কেউ বলছে, “সরকার কি কিছু করবে না?”

লাইভ চলতে চলতে খবরটি গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। টিভি চ্যানেলগুলো লাইভ সম্প্রচার শুরু করলো। হেডলাইনে বড় করে লেখা থাকলো, “রাতের শেষ ট্রেনে ভৌতিক ঘটনা—অদৃশ্য হচ্ছে মানুষ!” টিভির পর্দায় সানভির লাইভের চিত্র ফুটে উঠছে, তার অডিও সেটআপের আওয়াজে যাত্রীদের চিৎকার, কথোপকথন, সব কিছুই শোনা যাচ্ছে। 

তবে সেই সময় মেট্রো স্টেশনের মিরপুর শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা খবরটি দেখে বিরক্ত হয়ে যান। তিনি ফোনে চিৎকার করে বলছেন, “কী হচ্ছে এসব? স্টেশনের নাম এভাবে কলঙ্কিত হচ্ছে! সবাইকে বলো, এটা বন্ধ করো! যাত্রীদের কথা শুনে স্টেশন নিয়ে লোকজনের এমন ধারণা হতে দেয়া যাবে না।” তিনি রাগে ফেটে পড়লো স্টেশনের সকল কর্মচারীদের হুমকি দেন, “যদি এ নিয়ে আর কোনো গুজব ছড়ায়, আমি কড়া ব্যবস্থা নেব!”

ততক্ষণে ট্রেনের মধ্যে মানুষজন কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, আবার কেউ ভয় নিয়ে বগির শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যাত্রীরা হতবাক হলো,ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, “এটা কি দুঃস্বপ্ন নাকি?” কেউ আবার সাহস করে সানভির ফেসবুক লাইভ দেখে বলছে, “সরকার তদন্ত করবে, আমাদের আশা রাখতে হবে।” 

সবার মাঝেই এক ধোঁয়াশা আর আতঙ্কের ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে। ট্রেন যেন এক ভৌতিক জগতে আটকে গেছে।

ভয়ে পরিপূর্ণ পরিবেশে ট্রেন থেমে আছে, যাত্রীরা নিজেদের আসনের পাশে দাঁড়িয়ে একে অপরের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেউ বাইরে কি হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করছে, আবার কেউ নির্জন অন্ধকারে আশ্রয় খুঁজছে। তাদের একজন, এক বৃদ্ধ যাত্রী, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে থাকলো। হঠাৎ তার মাথা ঘুরে যায়, চোখে অন্ধকার দেখে সে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ে, মুখে অসহায়ভাবে ফিসফিস করে, “বাঁচাও… আমাকে বাঁচাও!”

চারপাশের অন্য যাত্রীদেরও যেন কিছুটা সাহস হারিয়ে যেতে থাকলো। এক মহিলা তাকে ধরে রেখে বলছে, “আপনি ভয় পাবেন না। এটা কিছু না… হলো,তো সাময়িক যান্ত্রিক সমস্যা।” কিন্তু তার নিজের কণ্ঠে এমন দুর্বলতা, যেন নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই কথাগুলো বলছে।

তখনই হঠাৎ এক ভয়াবহ চিৎকার ভেসে আসে, যেন অন্ধকারের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা কোনো অদ্ভুত কণ্ঠস্বর। চিৎকারটি এতটাই ভয়াবহ আর অস্বাভাবিক যে তা সমস্ত ট্রেনজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো, প্রতিটি হৃদয়কে আতঙ্কে কাঁপিয়ে তোলে। 

একজন যুবক কাঁপতে কাঁপতে বললো, “এই আওয়াজটা… এটা কোথা থেকে আসছে?” 

“ওটা কি কোনো মানুষ?” অন্য একজন প্রশ্ন করলো।

কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। কিন্তু সকলের মনে একটাই ভাবনা—কিছু একটা আছে এখানে, এমন কিছু যা কোনো সাধারণ ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো যাবে না। 

বৃদ্ধ লোকটি কাঁপতে কাঁপতে কান্নায় ভেঙে পড়লো। “আমার মনে হচ্ছে… আমি আর বাঁচবো না। এখানে কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ… মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে।” তার কথাগুলো শুনে পাশের লোকেরাও আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কিছু মানুষ নিজেরাই কান্না শুরু করে দেয়। 

সেই সময়, সানভির সেটআপ করা অডিও রেকর্ডার থেকে লাইভ সম্প্রচারিত হচ্ছিল। ফেসবুকে হাজার হাজার মানুষ এখন এই চিৎকার শুনছে, তাদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ কমেন্টে লিখছে, “এটা কী ধরনের আওয়াজ? কারও গলা তো এতো ভয়ানক হতে পারে না!” কেউ বলছে, “এই ঘটনা ভয়াবহ, যেন কোনো সিনেমা চলছে বাস্তবে।” আর সানভি, যে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে এই লাইভ দেখছে, অবাক হলো,ে ভেবে যাচ্ছে যে বাস্তবে এমন ভয়াবহ কিছু সম্ভব কিনা।

এদিকে স্টেশনের মিরপুর শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা পুরো ব্যাপারটা দেখে প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে উঠলোন। তিনি বুঝতে পারলেন, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। রেগে গিয়ে তিনি কর্মচারীদের হুমকি দেন, “এই ঘটনা আর কোনোভাবেই বাইরে প্রচারিত হতে দেয়া যাবে না। এমন কিছু ঘটে না! যদি আজ রাতের মধ্যে এই মেট্রো নিয়ে আরও কোনো গুজব ছড়ায়, তবে আমি কড়া ব্যবস্থা নেব!”

ট্রেনের ভেতরে যাত্রীরা তখনও স্থবির হলো,ে আছে। অজানা শত্রু বা শক্তির হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ বলছে, “আমরা সবাই এখানে আটকে পড়েছি।” কেউ প্রার্থনা করছে, “কেউ আমাদের বাঁচাও।” 

ট্রেনের সামনের দিকে বসা এক যুবক তীব্র কণ্ঠে বললো, উঠলো, “আমরা কি চিরদিনের জন্য এখানেই আটকে থাকবো?” তার কণ্ঠে তীব্র হতাশা ও আতঙ্ক মিশে রয়েছে।

কিছুক্ষণ পর ট্রেনের আলো আবার নিভে যায়, চারপাশে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে। যাত্রীরা চুপ হয়ে গেলো। তারা জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে, জানে না এই আতঙ্কের শেষ কোথায়।

ঠিক তখনই গোটা ট্রেন ঝাঁকি খেয়ে উঠলো। যেনো কোনো ছোট বাচ্চা তার খেলনা ট্রেনকে ধরে হাতে নিয়ে এদিক সেদিক করছে।


তিন.

তিনদিন আগের কথা-

সানভি, একজন মেধাবী ক্রিমিনোলজি পড়ুয়া ছাত্রী, যার মেধা এবং অনুসন্ধিৎসা তার সহপাঠীদের থেকে অনেকটাই আলাদা। তার চোখে সবসময় কিছু না কিছু নতুন খোঁজার আগ্রহ থাকলো,। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে সে বিশেষভাবে প্রিয়। তারা তাকে এমন একজন ছাত্রী হিসেবে দেখছে যে জটিল সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে, আসল কারণ খুঁজে বের করার জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে। সানভি কোনো সাধারণ ছাত্রী নয়—তার ব্যক্তিত্বে রয়েছে বিশেষ কিছু যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রাখছে।

শ্রেণীকক্ষে সানভির উপস্থিতি সবসময়ই শিক্ষকদের জন্য স্বস্তিদায়ক। কারণ তারা জানে, যে কোনো জটিল বিষয়েই তার প্রশ্ন থাকলো, এবং সে উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত থাকলো, না। ক্লাসের অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা যেখানে সাধারণ পাঠে সন্তুষ্ট থাকলো,, সানভি সেখানে আরও জানার চেষ্টা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি প্রফেসর, মিসেস আমান, তার চিন্তাধারা নিয়ে সবসময় উচ্ছ্বসিত। “তোমার মতো এরকম গভীরভাবে ভাবতে সহেখাটাও আমাদের ছাত্রছাত্রীদের শেখা উচিত,” প্রফেসর আমান একদিন ক্লাসে বললো,ছিলেন। সানভির এই গভীর মনোযোগই তাকে অন্যদের মধ্যে আলাদা করে রেখেছে।

তার বন্ধুরা মাঝে মাঝে তাকে মজা করে বলছে, “তুই কি পুলিশের গোয়েন্দা হতে যাচ্ছিস?” সানভি তখন হেসে বললো,, “না, আমি তো সত্যিকারের কারণগুলো খুঁজতে চাই রে। সব রহস্যের পেছনে একটা সত্য থাকলো,, তাই না?” বন্ধুরা হেসে তার কথায় সায় দিচ্ছে, কিন্তু তারা বুঝতে পারছে যে তার এই গভীর চিন্তাধারার কারণে সে ভবিষ্যতে অনেক দূর যাবে।

সানভির এই অনুসন্ধিৎসা এবং দৃঢ় মনোভাবের কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাকে ভালোবাসছে। তারা বুঝতে পারছে, সানভির মধ্যে এমন কিছু আছে যা তাকে অন্য যে কোনো সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের থেকে ভিন্ন করেছে। আর এই কারণেই তাকে প্রায়শই বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। সে কোনো কাজই সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না। প্রতিটি বিষয়ের গভীরে গিয়ে তার প্রশ্নগুলোর সমাধান খুঁজছে। 

এই শিক্ষাজীবনের এক পর্যায়ে, সানভির ক্রিমিনোলজি বিভাগের একটি অ্যাসাইনমেন্ট আসে। তাকে একটি মেট্রো স্টেশনের ঘটনা নিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে। বিষয়টি শোনার পরই তার মনে হলো, শহরের পুরনো মেট্রো স্টেশনটি মিরপুরে, এই কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কেননা সে শুনেছে যে এই স্টেশনটির পেছনে অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটেছে, এবং অনেক যাত্রী সেখানে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। সানভি ভাবছে, “এমন কিছু থাকতে পারে যা সবাই খেয়াল করছে না। এখানে কিছু গভীর রহস্য রয়েছে।”

সে মেট্রো স্টেশন পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ তার অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এই তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সানভির শিক্ষকরা তার সাহস এবং একাগ্রতাকে প্রশংসা করছে। কারণ তারা জানে, সানভির মনের এই অদম্য জিজ্ঞাসা তাকে যেকোনো সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সানভি যখন স্টেশনের পুরনো ঘটনার তথ্য খুঁজছে, ধীরে ধীরে রহস্যজনক কিছু সত্য সামনে আসতে শুরু করলো। সে জানতে পারে বহু বছর আগে, এই স্টেশনের নির্জন এক কোণায় এক নারীর সঙ্গে নির্মমভাবে একটি বর্বর ঘটনা ঘটেছিল। সেই নারী এখানে রাতে একা অপেক্ষা করছিল, যখন একদল লোক তাকে আক্রমণ করলো। কেউ ছিল না তার চিৎকার শোনার জন্য, কেউ ছিল না তাকে বাঁচানোর জন্য। সেই রাতে তার আর রক্ষা পাওয়া হলোনি। সেই নারীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর, স্টেশনটি যেন এক অভিশপ্ত স্থান হয়ে ওঠে। 

পুরনো পত্রিকার কাটিং থেকে সানভি দেখলো, স্থানীয় পত্রিকায় এই ঘটনাটির শুধু সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোনো বিশদ বিবরণ নেই, নেই কোনো সাক্ষী বা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এমনকি এই ঘটনায় অভিযুক্তদের নামও প্রকাশিত হলোনি। পুলিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে, “তদন্ত চলছে,” কিন্তু সানভি বুঝতে পারছে, আসলে সেই তদন্ত আর শেষ হলোনি। এমনকি আজও কেউ এই ঘটনাটি নিয়ে আর কিছু বলছে না। 

সানভি গভীরভাবে ঘটনাটি নিয়ে ভাবছে। কীভাবে এমন একটি ঘটনার কোনো বিচার হলো,নি? তার মনে হলো, হলো,তো তখন এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হলো,েছিল। সে নিজেই প্রশ্ন করছে, “এই স্টেশনেই এমন কিছু ঘটেছিল, আর এখন তার আত্মা কী সত্যিই এখানে প্রতিশোধ নিচ্ছে?”

প্রথমদিন যেদিন সে ভিজিটে গেলো ধীরে ধীরে রাত গভীর হলো, স্টেশনের অন্ধকারে যেন প্রতিটি ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সেই নারীর চিৎকার, তার ব্যথা, তার কান্না। সানভি অনুভব করলো, এখানে যেন শুধু ট্রেন আর যাত্রীদের নয়, আরও কিছু আছে যা সবার দৃষ্টির আড়ালে আছে। আচমকা স্টেশনের বাতি একবারের জন্য টিমটিম করে ওঠে, আর সেই মুহূর্তে সানভির মনে হলো, কেউ যেন তাকে দেখলো। সে পেছনে তাকিয়ে দেখে না কোনো মানুষ, কিন্তু বাতাসে যেন এক ধরনের গা ছমছমে গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, ঠিক যেন আতঙ্ক আর ব্যথার মিশ্রণ। 

সে ধীরে ধীরে তার ফোন বের করে, কিছু শব্দ রেকর্ড করার চেষ্টা করছে। স্টেশনের পরিবেশকে ধারণ করতে গিয়ে সে ভাবে, হলো,তো সেই ঘটনার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। কয়েক মুহূর্ত পরেই হালকা কণ্ঠে এক নারীর ফিসফিসানি শুনতে পেলো, যেন কেউ তাকে ডাকছে। শব্দটি খুব মৃদু, তবু তার ভেতরে এক শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে। কণ্ঠে আছে ব্যথা, ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা। 

সানভির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। সে ঠোঁট চেপে ধরে ভাবছে, “এটা কি সেই নারীর আত্মা? সত্যিই কি সে এখানেই রয়েছে, আর প্রতিশোধ নিচ্ছে?” তার মনে আসছে পুরনো সেই ভয়ানক ঘটনাটি। কীভাবে এক অসহায় নারীর জীবনের সঙ্গে খেলেছিল সেই পাষণ্ডরা, আর আজও সেই অপরাধীদের কেউ শাস্তি পায়নি। সানভি ঠিক করে, সে এই ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটন করেই ছাড়বে। এই স্টেশনকে শান্ত করতে, এই আত্মাকে মুক্ত করতে, তাকে এর শেষ দেখতে হবে। 

স্টেশনের অন্ধকার তার ওপর যেন ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু সানভি তার ভেতরের ভয়কে দমিয়ে রেখে অপেক্ষা করছে। সে নিশ্চিত যে এই রহস্যের মধ্যে একটা অদৃশ্য শক্তি রয়েছে, যা তার অপেক্ষায় আছে। সানভি জানে, তাকে আরও গভীরে যেতে হবে—এই স্টেশনের প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে থাকা অশান্ত আত্মার প্রতিটি ফিসফিসানি তাকে এখন টানছে, আর এই রহস্যের মর্মে পৌঁছানো ছাড়া সে থামবে না।

সানভি গত কয়েকদিন ধরে মেট্রো স্টেশন থেকে যে অদ্ভুত ঘটনাগুলো লক্ষ্য করেছে, তা ভাবললো, তার নিজেরই শরীর মাঝে মাঝেই রীতিমতো শিউরে উঠছে। কখনও শেষ ট্রেনে উঠে মানুষ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, কখনও আতঙ্কিত যাত্রীরা চিৎকার করে স্টেশনের দিকে তাকিয়ে থাকছে যেন তারা সেখানে কিছু দেখে ফেলেছে। এসব ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সানভি তার বন্ধুদের নিয়ে বসে, কারণ সে জানে এই রহস্যের পেছনে কিছু লুকিয়ে রয়েছে। তার বন্ধু আবীর, সিনথিয়া, ইমন আর সাদি সবাই এমন ঘটনাগুলো শুনে প্রথমে ভীষণ অবাক হয়ে যায়।

সানভি বলছে, "তোরা জানিস না, স্টেশনে গেলেই মনে হলো, কেউ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা অদ্ভুত গন্ধ আর ঠাণ্ডা অনুভূতি মেট্রোর বাতাসে ভাসছে। তাছাড়া যাদের সাথে ঘটনা ঘটেছে তাদের কেউই এই স্টেশন নিয়ে ভালো কিছু বললো, না।"

সিনথিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,, "এই ব্যাপারগুলো তো খুবই অদ্ভুত। কিন্তু তোদের মনে হলো না, এটা নিছক গুজবও হতে পারে? কারণ এত বছর ধরে এই স্টেশনে কিছু ঘটেনি তো।"

ইমন মাথা নাড়িয়ে বললো,, "কিন্তু যদি গুজব না হলো? দেখ, সানভির মতো সাহসী একজন মেয়ে এসব নিয়ে চিন্তিত। তোদের মনে নেই, সানভি হাল ছাড়ার মেয়ে না।"

আবীর ভ্রু কুঁচকে বললো,, "তাহলে কি তুই বলতে চাস, সত্যিই সেখানে কিছু আছে যা আমরা বুঝতে পারছি না? সানভি, তুই কি ভাবছিস? তোর অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এতখানি ঝুঁকি নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে?"

সানভি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,, "আমি জানি না। কিন্তু সত্যি বলতে আমি যা যা দেখেছি তাতে তো আর এটা গুজব বললো, মনেই হচ্ছে না। এমন কিছু অনুভূতি হয়েছে, যা ব্যাখ্যা করা যায় না। একটা অদ্ভুত ভয় যেন আমাকে তাড়া করে ফিরছে। রাতে ঘুমোতে গেলেও মনে হলো আমি স্টেশনের সেই অন্ধকারে আছি। আর সবসময় কেউ যেন বলছে, সে এখনও এখানে আছে।"

সাদি তখন বললো,, "তাহলে তোর সাথে আমিও যাবো। একটা সত্য যদি লুকিয়ে থাকলো,, তাহলে আমাদের সেটা উদ্ঘাটন করতে হবে। কিন্তু সাবধানে থাকবি, সানভি। আমাদের প্রয়োজন হলে তোর পাশে আমরা সবসময় আছি।"

এভাবে কথা বলতে বলতে রাত বাড়তে থাকলো,। তারা যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় যে সত্যিই কিছু একটা আছে, যা তাদেরকে এই ঘটনা অনুসন্ধানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শেষপর্যন্ত, তারা সবাই ঠিক করে রাত দশটায় আবার শেষ ট্রেনের যাত্রীদের পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখতে যাবে। 

সানভি বুঝতে পারে, সে একা নয়। তার বন্ধুদের সহায়তা আর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি তাকে সাহস জোগায়।

বন্ধুরা পরিকল্পনা ঠিক করে নিলেও বেরিয়ে পড়ার সময় শহরের গভীর রাতে ট্যাক্সি পাওয়া যেন এক বিশাল সমস্যায় পরিণত হলো। বারবার চেষ্টা করেও কোনো ট্যাক্সি পাওয়া যাচ্ছে না, যেন সবাই এই এলাকাটিকে এড়িয়ে চলে। শেষমেশ তারা হতাশ হয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকলো, যখন একজন প্রাইভেট কার নিয়ে এসে থামলো। ড্রাইভারকে অনেক অনুরোধ করতেই তিনি রাজি হলেন তাদের পৌঁছে দিতে।

গাড়ি ছুটছে শহরের রাস্তা ধরে। সানভি, আবীর, সিনথিয়া, ইমন আর সাদি গাড়ির পেছনে বসে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে। ড্রাইভার পেছনে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞাসা করে, "তোমরা সবাই এই রাতের বেলা কোথায় যাচ্ছ?"

সানভি একটু হেসে বললো,, "মেট্রো স্টেশনে যাচ্ছি।"

ড্রাইভার চমকে বললো,, "মেট্রো স্টেশন? এই সময়ে? ওইখানে তো কেউ যায় না! তোমরা কি জানো না, রাতে ওই স্টেশনে অনেক ভয়ঙ্কর জিনিস ঘটে?"

সিনথিয়া একটু বিরক্ত হয়ে বললো,, "দেখুন আংকেল ওসব কথায় কান দিই না। আমাদের নিজেদের কাজ আছে।"

ড্রাইভার একটু চুপ থেকে বললো,, "ঠিক আছে, কিন্তু আমি তো বললামই, ওই জায়গাটা নিয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। বিশেষ করে শেষ ট্রেনটা যখন আসে তখন একটা কিছু যেন স্টেশনে ঢুকে পড়ে। সে নাকি মানুষের ক্ষতি করলো। কয়েকজন যাত্রীর নিখোঁজ হওয়ার কথাও শুনেছি। তোমরা এত রাত করে ওইখানে যাওয়ার চিন্তা করছো?"

ইমন হেসে বললো,, "সবই গুজব। আমরা সবাই বড় হয়ে গেছি, এসব গল্পে আর বিশ্বাস করি না। স্টেশনে কিছু ঘটেছে, তাই আমরা দেখতে যাচ্ছি।"

আবীর ড্রাইভারের ভয় দেখানো কথাগুলো শুনে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,, "আসলে, আমরা ক্রিমিনোলজি নিয়ে পড়ছি। তাই যেকোনো ঘটনা আমাদের কাছে গবেষণার মতোই।"

ড্রাইভার কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,, "ঠিক আছে, আমার কাজ গাড়ি চালানো। তোমাদের নিয়ে পৌঁছে দিব। তবে সাবধানে থাকিও, এই জায়গাটা আসলেই ভালো না।"

গাড়ির ভেতরে কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে আসে। রাতের অন্ধকারে রাস্তাগুলো একদম ফাঁকা হয়ে গেছে। কেবল তাদের গাড়ির হেডলাইটের আলোই যেন রাস্তা আলোকিত করছে। এই নিস্তব্ধতা যেন আরো ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। বন্ধুরা ভেতরে ভেতরে একটু ভীত হলেও সবাই নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে।

অবশেষে স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছালে সাদি একদম সামনে ঝুঁকে বললো, "এইতো, এসে গেলাম।" 

গাড়ি থামে স্টেশনের বাইরে। বন্ধুরা একে একে নেমে পড়ে, তাদের মুখে সাহসের ছাপ, তবে চোখের গভীরে এক অদ্ভুত আতঙ্কের আভা ফুটে উঠেছে। রাতের শীতল বাতাস তাদের চামড়ায় কাঁটা দিয়ে ওঠায়, যেনো কেউ তাদের প্রতি নজর রাখছে।


চার.

স্টেশনে পৌঁছানোর পর, সানভি আর তার বন্ধুরা চারপাশটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলো। স্টেশনের পুরনো দেয়ালগুলোয় জমে থাকা শ্যাওলা, গুমোট বাতাস, আর অন্ধকারের গভীরতা যেনো সবকিছুকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। কয়েকজন যাত্রীকে তারা খুঁজে পেলো, যারা ভয়ে কাঁপছে, চোখে আতঙ্ক আর মুখে অসহায়তার ছাপ। সানভি দ্রুত সবাইকে উদ্ধার করতে উদ্যত হলো, আবীর আর সাদির সাহায্যে তাদেরকে স্টেশন থেকে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে আসে। আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি গোটা জায়গাটাকে বেঁধে রেখেছে।

এমন সময়, স্টেশনের কোণায় তারা একজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। তার মুখখানা অন্ধকারে ছায়াময়, তবে তার চোখে এক অদ্ভুত ভীতি আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। লোকটি তাদের দিকে এগিয়ে এসে সানভির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, উঠলো, “তোমরা এখানে কেন এসেছো? এই জায়গা তো অভিশপ্ত। আমি অনেকদিন ধরে চুপচাপ ছিলাম, কিন্তু আর সহ্য করতে পারছি না।”

সানভি আগ্রহ নিয়ে বললো, “আপনি এখানে কী করছেন? আমাদের একটু বলবেন, আসলে এখানে কী ঘটেছে?”

লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “অনেক বছর আগে এখানে একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি নিজে সাক্ষী ছিলাম সেই ভয়ংকর রাতের। মেট্রোর এই স্টেশনে এক মেয়েকে গণধর্ষণ করা হয়েছিলো। সে নিষ্পাপ ছিলো, কোনো দোষ ছিলো না তার। কিছু পশু তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে রেখে দেয়। সে যখন মারা যায়, তার শরীরটা মাটিতে পড়েছিলো, আর আমি তখন দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছিলাম।”

সবাই স্তব্ধ হয়ে তার কথা শুনছে, আর সানভির চোখে এক ধরনের বিস্ময় ফুটে উঠছে। সে আস্তে করে বললো,, “তাহলে আপনি কিছু করেননি? কেন কিছু বললেন না? কেন পুলিশকে ডাকেননি?”

লোকটির মুখটা যেন আরও কালো হয়ে গেল, তার কণ্ঠস্বরটা কাঁপছে। “কিছু করতে পারিনি মা। আমি ভয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। কেমন ভয়াবহ ছিল সেই রাত, বুঝলি? আজও আমার মনে আছে। মাঝে মাঝে মনে হলো সেই মেয়েটি আমাকে দেখতে আসে। ঘুমাতে পারি না, তার মুখটা সবসময় চোখের সামনে ঘোরে।”

সিনথিয়া হতাশ কণ্ঠে বললো, “তাহলে আপনি কেবল চুপচাপ দেখে গেলেন? নিজের চোখে দেখে কিছু করলেন না?”

লোকটি একটু হেসে মাটির দিকে তাকালো,, যেন নিজের অপরাধবোধ স্বীকার করছে। “হ্যাঁ, আমি তখন কিছুই করতে পারিনি। আজও সেই দুঃস্বপ্ন আমার পিছু ছাড়ে না। জানিস, মাঝে মাঝে মনে হলো ওই মেয়েটার আত্মা এখানে রয়ে গেছে। সেই জঘন্য রাতের প্রতিশোধ নিতে চায়।”

সানভি তার বন্ধুদের দিকে তাকালো,, তার মুখে দৃঢ়তার ছাপ। “আমরা এখানে এসেছি সত্যিটা জানার জন্য। আপনার কথা শুনে আরও স্পষ্ট হলাম, এই জায়গায় কিছু একটা ঘটছে। সেই মেয়েটার আত্মা যদি এখানেই থাকলো,, তবে আমরা তাকে মুক্তি দিতে চাই।”

লোকটি চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো,, তার চোখে আতঙ্ক আর অনুশোচনা ঝলমল করছে। এই অকথ্য ঘটনার সাক্ষী হিসেবে সে জীবনের প্রতিটা দিন যন্ত্রণায় কাটাচ্ছে। 

সানভি মনে মনে ভাবছে, কিভাবে এই অত্যাচারের বিচার হবে।

সানভি আর তার বন্ধুরা স্টেশনের নির্দিষ্ট জায়গায় লোকটির অপেক্ষা করছে। গত রাতের ঘটনাগুলো এখনো তাদের মনে গেঁথে আছে। সেই ভৌতিক কাহিনি শুনে রমজানের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো, সে কিছু গোপন করছে। সানভি অনেক জোরাজুরি করলে রমজান শেষমেশ স্বীকার করে, যে সে এই স্টেশনের পুরনো ঘটনায় জড়িত ছিলো। তার গলা কাঁপছে, চোখে ভয় যেন বারবার মুখে এসে ফুটে উঠছে। সানভি তাকে প্রশ্ন করে, কিন্তু সে সরাসরি কিছু বলতে পারছে না। 

“সত্যি বলো রমজান, তুমি কি সেই মেয়েটির উপর অত্যাচার করেছিলে?” সানভি সোজাসুজি জানতে চায়।

রমজান প্রথমে চুপ করে থাকলো,, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। “হ্যাঁ,” সে অল্পস্বরে বললো,, “আমরা কয়েকজন মিলে… সে ছিলো শুধুই একটা মেয়ে। আমার আর কিছুই মনে পড়ছে না। এ যেন আমার জীবনের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

সানভি এবং তার বন্ধুরা তাকে আরও কিছুক্ষণ প্রশ্ন করে, তার কাছ থেকে একটা লিখিত জবানবন্দী নিয়ে নেয়। রমজান কোনো এক অদৃশ্য আতঙ্কে ভয়ে আতঙ্কিত হচ্ছে। সে আর কথা বাড়াতে চায় না, বারবার বললো,, “আমি আর কিছু জানাতে চাই না। আমার পাপের শাস্তি হয়ে গেছে। কালকে সকালে বাসায় এসো, ঠিকানা দিয়ে দেবো।”

পরের দিন রাতে সানভি আর তার বন্ধুরা রমজানের বাসায় যায়। কিন্তু তার বাড়ির লোকজন জানায়, রমজান তো বাইরে গেছেন, সম্ভবত স্টেশনে। সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকালো,। স্টেশনে রমজান কী করছে?

সানভি আর তার বন্ধুরা দ্রুত স্টেশনের দিকে দৌড়ায়। সেখানে পৌঁছে তারা দেখে, স্টেশন ফাঁকা। রাতের ভৌতিক গল্পগুলো যেনো আরও ভীতিকর বাস্তব হয়ে ফুটে উঠছে। স্টেশনের টয়লেটের দিকে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে সবার, যেনো কিছু একটা ঘটতে চলেছে। 

হঠাৎ সাদা কাপড় পরা কিছু একটা টয়লেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। তারা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো,, নিশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে আসে। সাদা কাপড়ে মোড়া ওই আকৃতিটা ধীরে ধীরে অন্ধকার কোণ বরাবর চলে যায় এবং মিলিয়ে যায়। সানভির মনে এক অদ্ভুত ভয় অনুভব হলো, সে অনুভব করে যেনো সত্যিই সেই অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

জড়সড় হয়ে তারা টয়লেটের ভেতর ঢুকলো, আর ভিতরে যা দেখে সেটা তাদের অবাক করে দেয়। রমজান মাটিতে পড়ে আছে। তার শরীর নিথর, মুখের ওপর গভীর ভয় আঁকা। যেনো মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে তার সামনে কিছু ভয়ংকর দৃশ্য দেখা দিয়েছিল। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। সানভি স্পষ্ট বুঝতে পারে, রমজান মারা গেছে।


পাঁচ.

সানভি আর তার বন্ধুরা দৌড়ে সেই সাদা রঙের অশরীরীকে ধরার চেষ্টা করছে। আশ্চর্যজনকভাবে সে অদৃশ্য হয়ে গেছে। সানভি থেমে মোবাইলটা বের করে সেই পুরনো পেপার কাটিং দেখে, যেখানে হত্যাকারীদের নামের তালিকায় রমজান এবং সামশুলের নাম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সানভির মুখে হতাশার ছাপ ফুটে ওঠে। সে বুঝতে পারে, সামশুলই এই ভয়ঙ্কর অতীতের অপরাধে জড়িত আর সেই পাপের ফল ভোগ করতে হবে তাকে।

ঠিক এমন সময় সাদির ফোনে কল আসে। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, “আপনি সামশুল? আমরা স্টেশনে আছি, রমজান… সে মারা গেছে, টয়লেটের কাছে পড়ে আছে।”

সামশুলের ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, “আমি আসছি… একটু অপেক্ষা করো, আমি টয়লেটের দিকে যাচ্ছি।”

ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সানভি আতঙ্কিত গলায় বললো, “হায় হায়, এবার উনাকেও হারাবো আমরা!” সবার চোখে গভীর উৎকণ্ঠা, এবং তারা ছুটে চলে টয়লেটের দিকে।

স্টেশনের করিডোর যেন শূন্য, আর রাতের সেই নির্জনতা আরও বেশি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। সামশুল ইতিমধ্যেই টয়লেটের ভেতরে ঢুকে গেছে। ভিতরে সে একের পর এক ভৌতিক ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে। দেয়ালে তার ছায়া দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু সেটা যেনো তার নিজের নয়। হঠাৎ মেঝেতে পানির ঢেউ উঠলো, এক অদ্ভুত শীতল বাতাস তাকে ঘিরে ধরলো। একসময় পানির ঢেউ সাদা অবয়বে রূপ নিলো। দৌড় দিলো সামশুল। সামশুলের গলা শুকিয়ে আসে, হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। আর ঘাড়ের পেছনে মনে হয় যেনো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। দৌড়োতে দৌড়োতে সামশুল করিডরের শেষ মাথায় পৌছানোর চেষ্টা করছে। পেছন থেকে দুদ্দাড় দুদ্দাড় দৌড়ের আওয়াজ আসছে।

তারপরই সামশুল আহত অবস্থায় টলমল পায়ে নিজের বন্ধু রমজানের লাশের কাছে পৌঁছায়। পুরো শরীর কাঁপছে, মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তার চোখে কিছুটা অনুশোচনাও ফুটে ওঠে। তখনই সানভি এবং তার বন্ধুরা দৌড়ে পৌঁছায়, সামশুলের একশো গজ আগে। তাদের চোখে সামশুলকে নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট।

“দোস্ত আমরা কি করছিরে। আমাগো দোষ। আমরা…”

ঠিক সেই মুহূর্তে সাদা কাপড়ে মোড়া অশরীরীটি তাদের সামনে ভেসে আসলো। অন্ধকারে সেই মুখাবয়ব যেন সবার শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে তুললো। আঙুল তুলে সামশুলের দিকে দেখিয়ে বললো, “এই সে খুনী। এ আমাকে খুন করেছে, আমার সম্মান কেড়ে নিয়েছে।” কণ্ঠে যেন প্রতিশোধের আগুন।

সামশুল ভীতভাবে বললো, “আমি… আমি ভুল করছি, কিন্তু এইভাবে…”

হঠাৎ সামশুল বাতাসে ভেসে উঠলো। বিস্ফারিত চোখে সবাই চেয়ে দেখলো সামসুলের ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরে গেলো অসম্ভবভাবে। মড়াৎ করে একটা আওয়াজ হলো।

তারপর সব শেষ।

অশরীরী ধীরে ধীরে তাদের দিকে তাকিয়ে বললো, “বিচারটা আমিই করলাম। তোমরা আমার কারণে বিচলিত হয়ো না। ভয় পাওয়ার দরকার নেই।”

এক মুহূর্তে চারপাশে যেনো গভীর নীরবতা নামে। সাদা অশরীরীটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় অন্ধকারের মধ্যে, কিন্তু সে চলে যাবার পরও সানভি অনুভব করে যেন সেই অদৃশ্য উপস্থিতি চারপাশে ছায়ার মতো রয়ে গেছে। 

এমন পরিস্থিতিতে সানভির মনে একটা প্রশ্ন ফুটে ওঠে - এই আত্নার প্রতিশোধ কি আসলে শেষ হয়েছে, নাকি এখনও সেই অতৃপ্ত আত্মা এভাবেই দণ্ড দিতে থাকবে?

Post a Comment

Previous Post Next Post