দুই.
অন্ধকার আস্তানাটির ভেতর বাতাসের একমাত্র স্পন্দন বলতে বাজের নিশ্বাসের ভারী শব্দ আর হাইড্রোলিক সকেটের মৃদু ক্লিক-ক্লিক আওয়াজ। ৯৯তম পৃথিবীর ঢাকা শহরের ওপরতলায় এখন উল্লাস চলছে, কিন্তু এখানে নিচের স্তরে কেবল মরচে আর তেলের রাজত্ব।
বাজ একটা ডেক্সটপ ল্যাম্পের নীলাভ আলোয় ঝুঁকে আছে তার বাম ডানার ওপর। গত রাতের লড়াইয়ে মেয়রের ক্যাডারদের ছোড়া একটা আর্মার-পিয়ার্সিং বুলেট ডানার মেইন জয়েন্টের এক ইঞ্চি পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সে একটা সিরিঞ্জ দিয়ে স্বচ্ছ লুব্রিকেন্ট ফ্লুইড পুশ করছে ডানার হাইড্রোলিক আর্টারিতে। লিকুইডটা ভেতরে যাওয়ার সময় একটা চাপা শিস ধ্বনি তৈরি হলো—যেন কোনো জখম হওয়া জানোয়ার যন্ত্রণায় ফুঁসছে।
স্নায়ু আর ধাতুর মিলনস্থলে একটা সূক্ষ্ম কম্পন। বাজ চোখ বন্ধ করল। তার কাঁধের হাড়ের সাথে যেখানে টাইটানিয়াম ফ্রেমটা রিভেট করা, সেখানে একটা পুরনো ব্যথা চিনচিন করে উঠছে। এই ব্যথাটা তার শরীরের অংশ হয়ে গেছে। সে একটা ন্যাকড়া দিয়ে ডানার কার্বন-ফাইবার পালকগুলো মুছতে শুরু করল। প্রতিটি ঘর্ষণে পালকগুলো থেকে গত রাতের রক্তের কালচে ছোপ উঠে আসছে, আর বেরিয়ে পড়ছে নিচের ধোঁয়াটে ধূসর মেটাল।
রক্তের গন্ধটা ফিকে হয়ে আসতেই ডেরার ভ্যাপসা বাতাসে পোড়া গ্রিজ আর ওজোনের গন্ধটা আবার প্রকট হয়ে উঠল। বাজের মনোযোগ এখন তার ডেরার কোণে রাখা একটা ডিক্রিপ্টেড হলোগ্রাফিক প্রজেক্টরের দিকে। গত রাতে সাংবাদিক ইশতিয়াককে বাঁচানোর সময় তার পকেট থেকে একটা এনক্রিপ্টেড ডাটা-চিপ বাজ হাতিয়ে নিয়েছিল। চিপটা সে রিডারে ঢোকাল।
বাতাসে ভেসে উঠল একটা কাঁপাকাঁপা হলোগ্রাম। মেয়রের ব্যক্তিগত অফিসের দৃশ্য। মেয়র জাহেদ কোনো এক অচেনা স্যুট পরা লোকের সাথে কথা বলছে। তাদের মাঝখানের টেবিলে রাখা একটা ছোট কাঁচের ভায়াল, যার ভেতরে একটা জমাটবদ্ধ রক্তবর্ণের তরল ধকধক করছে।
"স্ম্যাশ," বাজ ফিসফিস করে বলল। তার কণ্ঠস্বর যান্ত্রিক ফিল্টারে আরও গম্ভীর শোনাল।
হলোগ্রামে মেয়রকে বলতে শোনা গেল, "ডোজ বাড়িয়ে দাও। বস্তির মানুষগুলো মরে মরুক, আমাদের এমন একদল জানোয়ার চাই যারা বাজের মতো জঞ্জালদের ডানা ছিঁড়ে ফেলবে।"
বাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে তার ডানার একটা ব্লেড আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। ব্লেডটা এখন এতটাই ধারালো যে বাতাসের কণা কাটতেও সে সক্ষম। সে বুঝল, মেয়র কেবল ড্রাগ বিক্রি করছে না; সে একটা কৃত্রিম সেনাবাহিনী তৈরি করছে। এই ডেরার নিস্তব্ধতা এখন আর প্রশান্তি দিচ্ছে না, বরং একটা ঝড়ের আগের সংকেত দিচ্ছে।
সে তার ডান হাত দিয়ে একটা ভারী রেঞ্চ তুলে নিল। ডানার শেষ জয়েন্টটা আরও টাইট দিতে হবে। আজ রাতে তাকে শুধু শিকার করলে চলবে না, তাকে স্ম্যাশারদের হাড় গুঁড়ো করার মতো শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। বাজের ডেরার ওপর দিয়ে একটা বড় কার্গো ড্রোন যাওয়ার সময় পুরো ঘরটা একবার কেঁপে উঠল, আর সেই কম্পনের সাথে সাথে বাজের যান্ত্রিক পাখনার ব্লেডগুলো একবার সশব্দে খুলে আবার বন্ধ হলো।
রাতের ঢাকা অপেক্ষা করছে, আর বাজ তার ডানাগুলোকে শান দিচ্ছে সেই অন্ধকারকে চিরে ফেলার জন্য।
৯৯তম পৃথিবীর এই ঢাকা শহরের রাতগুলো কখনো শান্ত হয় না; শুধু শব্দের ধরন পালটায়। ওপরতলার অট্টালিকাগুলো থেকে ভেসে আসা সিন্থেটিক মিউজিকের ঝংকার নিচে নামতে নামতে ড্রেন আর জঞ্জালের গন্ধে ফিকে হয়ে যায়। বাজের আস্তানার ভেতর এখন কেবল একটা একঘেয়ে যান্ত্রিক গুঞ্জন। রিডারে লাগানো চিপটা থেকে নির্গত নীলাভ আলো তার হেলমেটহীন বিষণ্ণ মুখে এক অতিপ্রাকৃত আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ডকইয়ার্ডের সেই লড়াইটা তার স্মৃতিতে এখনো টাটকা। সাধারণ মাফিয়ারা লড়াই করে টাকার জন্য, কিন্তু গত রাতে জাহাঙ্গীরের লোকেদের চোখে সে যা দেখেছিল, তা ছিল অন্ধ আনুগত্য—এক ধরণের যান্ত্রিক উন্মাদনা। বাজের হাতের আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। সে ইশতিয়াকের সেই ডাটা-চিপের গভীরে ঢুকছে। এনক্রিপশনের লেয়ারগুলো একে একে সরতেই একটা বিশাল নেটওয়ার্কের ম্যাপ ফুটে উঠল তার চোখের সামনে।
ম্যাপের কেন্দ্রবিন্দুতে একটা নাম বারবার স্পন্দিত হচ্ছে: 'সিটি গভর্নেন্স প্রটোকল'। এটি কোনো গ্যাংস্টারের আস্তানা নয়, এটি শহরের খোদ মেয়রের ব্যক্তিগত ডিজিটাল সিগনেচার।
বাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যা তার যান্ত্রিক ফুসফুসে ধাক্কা খেয়ে একটা ধাতব শব্দ তৈরি করল। তদন্তের সুতোটা যত এগোচ্ছে, জট তত বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন হচ্ছে। মেয়রের অফিসের গোপন সিসিটিভি ফুটেজের একটা অংশ সে রিকভার করতে সক্ষম হলো। স্ক্রিনে ফুটে উঠল জাহেদ মেয়রের সেই চিরচেনা ধূর্ত মুখ। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে 'স্ম্যাশ' ড্রাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর।
"জাহাঙ্গীর ব্যর্থ হয়েছে," মেয়র জাহেদের কণ্ঠস্বরটা স্পিকারে কোনো সাপের হিসহিসানির মতো শোনাল। "বাজ নামের ওই জঞ্জালটা আমাদের ডেলিভারি আটকে দিয়েছে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। পরের চালানটা সরাসরি পুলিশি পাহারায় যাবে। আর শোনো, ওই সাংবাদিক ইশতিয়াককে যারা পালাতে সাহায্য করেছে, তাদের ডিএনএ স্যাম্পলগুলো ল্যাবে পাঠাও। আমি জানতে চাই, ওই ডানার নিচে মাংস নাকি শুধুই লোহা আছে।"
বাজ স্ক্রিনটা পজ করল। মেয়রের কথাগুলো তাকে এক গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। এটা কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; মেয়র তার 'স্ম্যাশ' ড্রাগ ব্যবহার করে পুরো শহরটাকে একটা বিশাল ল্যাবে পরিণত করেছে। সে সাধারণ মানুষকে গিনিপিগ বানিয়ে একদল এমন ঘাতক তৈরি করছে যাদের শরীরে ব্যথা বা ভয়ের কোনো অনুভূতি নেই। ডকইয়ার্ডের সেই গুন্ডারা ছিল কেবল প্রাথমিক পরীক্ষা। আসল আতঙ্কটা এখনো মেয়রের গোপন কুঠুরিতে দানা বাঁধছে।
বাতাসে লুব্রিকেন্ট তেলের কটু গন্ধটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। বাজের মনে পড়ে গেল গত রাতের লড়াইয়ের সেই বুলেটটার কথা। সে ড্রয়ার থেকে বুলেটের খোলসটা বের করল। সাধারণ ৯ এমএম নয়, এটাতে খোদাই করা আছে মেয়রের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর সিলমোহর। তার মানে, প্রশাসন আর অপরাধ জগত এখন আর আলাদা কোনো সত্তা নয়; তারা এখন একই দেহের দুই হাত।
বাজ উঠে দাঁড়াল। তার পিঠের মেটাল ফ্রেমটা মৃদু শব্দে সংকুচিত হলো। সে বুঝতে পারল, সে কেবল একটা ছোট গ্যাংস্টারের টুঁটি চেপে ধরেনি, সে আসলে এই জরাজীর্ণ সিস্টেমের হৃৎপিণ্ডে আঘাত হেনেছে। মেয়র জাহেদ এখন আর তাকে শুধু একজন 'রাতের প্রহরী'র সাইডকিক হিসেবে দেখছে না; সে তাকে দেখছে তার ব্যবসার পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হিসেবে।
তদন্তের প্রতিটি ডেটা পয়েন্ট তাকে ইশারা করছে শহরের উত্তর প্রান্তের সেই নিষিদ্ধ জোনের দিকে—যেখানে মেয়রের বায়ো-টেক ল্যাবটি অবস্থিত। সেখানে কেবল ড্রাগ তৈরি হয় না, সেখানে তৈরি হচ্ছে বাজের যান্ত্রিক ডানার যোগ্য প্রতিপক্ষ। বাজের দৃষ্টি স্থির হলো দেয়ালের এক কোণে ঝুলে থাকা তার যুদ্ধের ম্যাপটির ওপর। মেয়রের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কফিনে শেষ পেরেকটি মারতে হলে তাকে এখন সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত করতে হবে। কিন্তু সে জানে, সেই পথটা হবে রক্ত আর তপ্ত লোহার গন্ধে ভরা।
বাজ তার পিঠের বাম ডানার ব্লেডটি একবার সশব্দে খুলল। অন্ধকারের নীল আলোয় ব্লেডের ধারালো প্রান্তটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। বাজের চোখে এখন আর তদন্তকারীর ক্লান্তি নেই, সেখানে কেবল একজন শিকারির একাগ্রতা। সে নিচু স্বরে নিজেকেই বলল, "জাহেদ, তুমি শুধু ড্রাগ তৈরি করোনি, তুমি নিজের জন্য একটা জল্লাদ তৈরি করেছ। আর সেই জল্লাদ আজ রাতে তোমার দরজায় কড়া নাড়বে।"
আস্তানার স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে মেয়রের ল্যাবের চুরি করা ডাটাগুলো প্রজেক্টরে ভেসে উঠছে। নীলচে আলোর নিচে বাজ স্থির হয়ে বসে আছে, তার যান্ত্রিক ডানা দুটো পিঠের ওপর গুটিয়ে রাখা। স্ক্রিনে একটা ভিডিও ফাইল প্লে হতেই বাজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
ভিডিওটা কোনো ল্যাবরেটরির ভেতরকার। কাঁচের ওপারে একটা মানুষ—না, এককালে মানুষ ছিল। এখন তার গায়ের চামড়া ফেটে মাংসপেশিগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠেছে, শিরাগুলো কালচে রঙের হয়ে শরীরের ওপর দিয়ে দড়ির মতো জেগে আছে। ল্যাবের লোকগুলো তার শরীরে ইনজেকশন দিয়ে লাল রঙের এক ঘন তরল পুশ করছে।
'স্ম্যাশ' (Smash)।
বাজের যান্ত্রিক চোখের লেন্স জুম করল। এই সেই তরল, যা ৯৯তম পৃথিবীর ঢাকাকে একটা জ্যান্ত কবরে পরিণত করছে। ভিডিওর লোকটা ইনজেকশন নেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু সেই চিৎকার মানুষের নয়; তা ছিল কোনো আদিম পশুর গর্জনের মতো। এক ঝটকায় সে তার হাতের ভারী লোহার শিকল ছিঁড়ে ফেলল, যেন সেগুলো কাগজের তৈরি। তার চোখের মণি অদৃশ্য হয়ে গিয়ে সেখানে টকটকে লাল আভা ফুটে উঠল। সিসিটিভি ক্যামেরাটা ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখা গেল, লোকটা খালি হাতে ল্যাবের কংক্রিটের দেয়াল গুঁড়ো করে দিচ্ছে।
বাজ স্ক্রিনটা পজ করল। লুব্রিকেন্ট তেলের গন্ধে ভরা ডেরায় এখন এক গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। স্ম্যাশ কেবল কোনো ড্রাগ নয়, এটা একটা বায়ো-মেকানিক্যাল এনহ্যান্সার। এটি মানুষের অ্যাড্রেনালিনকে কয়েক হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয় আর স্নায়ুতন্ত্রকে এমনভাবে ওভারলোড করে যে ব্যবহারকারী কোনো ব্যথা অনুভব করে না। মেয়র জাহেদ এই ড্রাগ দিয়ে একদল 'স্ম্যাশার' তৈরি করছে—যাদের থামাতে বুলেট কাজ করবে না, কোনো নৈতিকতা কাজ করবে না।
বাজ তার টেবিল থেকে একটা খালি ভায়াল তুলে নিল, যেটা সে ডকইয়ার্ডের লড়াইয়ের পর কুড়িয়ে পেয়েছিল। ভায়ালের গায়ে লাগানো লেবেলে ছোট করে একটা কোড লেখা: 'Project: Icarus-99'।
বাজের বুকের ভেতরের মেকানিক্যাল কোরটা একবার জোরে স্পন্দিত হলো। সে বুঝতে পারল, ইশতিয়াককে বাঁচানো কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। মেয়র চাচ্ছে বাজকে বাইরে টেনে আনতে। মেয়র চাচ্ছে দেখতে—বাজের এই যান্ত্রিক পাখনার জোর বেশি, নাকি তার তৈরি এই দানবীয় স্ম্যাশারদের পেশির শক্তি?
বাতাসে গ্রিজের গন্ধটা যেন হঠাৎ করেই পাল্টে গিয়ে রক্তের গন্ধের মতো মনে হতে লাগল। বাজের ডেরার ওপরতলায় কারখানার টিনের চালে ভারী কোনো কিছুর আছড়ে পড়ার শব্দ হলো। বাজের যান্ত্রিক পাখনার ব্লেডগুলো সশব্দে খুলে গেল, হাইড্রোলিক পিস্টনগুলো যুদ্ধের জন্য তৈরি। সে জানে, ওরা এসে গেছে। স্ম্যাশাররা তার ঘরের দরজায়।
সে হেলমেটটা মাথায় পরল। ডার্ক ভাটিক্যাল ডিসপ্লেতে লাল অক্ষরে লেখা উঠল: "Threat Level: Fatal."
বাজ তার ডানা দুটো প্রসারিত করে অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর থেকে শুধু একটা শব্দ বেরিয়ে এল— "শিকার শুরু।"
