মরনপণ || pdf

ফরাজি কন্সোলিডেটেড। বিশাল ব্যবসায়ের গ্রুপ। সৃষ্টিশীলদের জন্য স্বর্গ। যার যা খুশি তাকে তা করতে দেয়া হয় তার মনের মতন। অবশ্য সবকিছুই ভালো উদ্দেশ্যে। হাসমান ফরাজির বাপ-দাদা চৌদ্দ গুষ্টির সবাই সেই ব্রিটিশ আমল থেকে মানবকল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। তাদের জমিদার নাম হারিয়ে গেছে জনহিতৈষীমূলক কর্মকান্ডে। এখন এসব কথা বাদ। কথা বলবো এমন একজনের যে কিনা খুব অল্প বয়েসে ফরাজি গ্রুপের নির্বাহী প্রধানের দ্বায়িত্ব নিয়েছেন কিছুদিন আগে। হ্যাঁ, মিশুর কথা বলছি। মিশুর গোপন পরিচয় সে একজন ভিজিলেন্টি। ভিজিলেন্টির কাজ কি? যে অপরাধ অন্যায় সহ্য করতে পারেনা এবং তার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবশ্য আইন প্রয়োগ সংস্থার রীতিনীতির সম্পূর্ণ বিপরীতে যায় ভিজিলেন্টিদের কর্মকান্ড। মিশু বড় ধরণের বিপদে পড়েছে। বিষয়টা হলো তার বাগদত্তা জাইমার বাবা হাসমান ফরাজি। আর তার স্ত্রী মিসেস ফরাজি উত্তর ঢাকার মেয়র। কিন্তু, বিপদের কথা হচ্ছে মিসেস ফরাজির ক্যান্সার ধরা পড়েছে বেশিদিন হয়নি এবং তার দাপ্তরিক সকল কাজকর্ম মিশুকে সামলাতে হচ্ছে। আবার এদিকে ফরাজি কন্সোলিডেটেড এর কাজও সামলাতে হচ্ছে। জাইমা, তার হবু স্ত্রী। সেও ভিজিলেন্টি। তার ভাই আইমানও ভিজিলেন্টি। এদের একটি গ্রুপও আছে যার নাম প্রহরী কর্প। প্রত্যেকেরই আলাদা স্বকীয়তা আছে। যেমন মিশুর আছে ডিজিটাল বুমেরাং। জাইমার আছে ইলেক্ট্রিফায়েড চাবুক। যার কারণে জাইমার অন্য নাম চাবুকি। আর আইমানের স্পেশাল বডি স্যুট বাজপাখির মতো কৃত্রিম মেকানিক্যাল ডানা। যার জন্য তাকে বলা হয় বাজজজজ।
-মাকে মেডিসিন দিয়েছে?
-হ্যাঁ একটু আগে খেলো। কন্ডিশন ভালো ঠেকছে না ডক এর কাছে।
-আচ্ছা, আমি দুপুরে খেয়ে আসছি তোমাদের...
-মিশু, আম্মু কথা বলছে না। আম্মু...
-কি বলো?! জাইমা...
-আম্মুর হাত পুরো ঠান্ডা মিশু। ডক... আম্মু নড়ছে না।
স্তব্ধ হয়ে গেছে মিশু। মিসেস ফরাজি মারা গেছেন। তার হবু শ্বাশুড়ি মারা গেছেন।
মরদেহ পরিবহনের গাড়ি চলে এসেছে অনেক আগেই। মেয়রের লাশ দেখতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমে গেছে। তাদের প্রিয় মেয়র মারা গেছেন। এই একমাত্র লৌহমানবী যিনি এক বছরের মাথায় সোজা করে ফেলেছেন উত্তর ঢাকাকে। তার পরিবর্তনের ছোঁয়ায় রাস্তায় ধুলি নেই। ডাস্টবিনে ময়লার দুর্গন্ধ নেই। সিটি করপোরেশনের ভেতরে গেঁড়ে থাকা দুর্নীতি একটানে তুলে ফেলেছেন আগাছার মূলোৎপাটনের মতো। তাকে দেখতে আসবে না তো কাকে আসবে? শেষ দেখা দেখতে। ভীড়ের মাঝখানে একজনের দিকে চোখ আটোকে গেলো মিশুর। এর মতিগতি ভালো ঠেকছে না। কেমন যেনো চাউনি যা কখনো ভালো মানুষের বলে মনে হতে পারে না। ওই দেখায়ই আটকে গেলো।
লাশ দাফনের তিন-চারদিন পরের কথা। মনে পড়ে গেলো লোকটার কথা। জাইমাদের লিভিং রুমে বসে আছে এমন সময় চোখ পড়ে গেলো বিশাল হোম স্ক্রীণ জায়ান্ট টিভিতে। আরে এই তো সেই লোক! একেই তো দেখেছিলো সেদিন। জাইমার মায়ের শেষকৃত্যের আগের দিন যখন মানুষের ঢল নামে হাসপাতালে।
"কথা বলছি আকবর মুরসালিনের সাথে। বিশিষ্ট শিল্পপতি, দানশীল একজন যিনি সিটি করপোরেশন ফান্ডে জমা দিতে যাচ্ছেন বিশাল অংকের অর্থ এবং মরহুমা সাবেক মেয়রকে তিনি উৎসর্গ করছেন।"
-তাজ্জব বনে যাচ্ছি। মা মারা গেলেন চারদিনই পার হয়নি এর ভেতর ডোনেশন।
টিটিটুট্যাট। জাইমার মিশুর ফোনের স্ক্রীনের দিকে বোবা হয়ে তাকিয়ে আছে। মা হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছে।
-হ্যালো, হাসান।
-মিশু ভাই, এক্সাইটিং ভয়ংকর নিউজ আছে।
-তোমরা সাংবাদিকরা সবসময় এসব অতিরঞ্জিত করো ক্যানো? নরমালি ব্যাপারটা উপস্থাপন করতে পারো না?
-আহ শুনেন না। এইমাত্র আকবর মুরসালিন নামে যাকে টিভিতে দেখেছেন সে একজন সিরিয়াল কিলার ছিলো আশির দশকে!
-কিহ! লাফ দিয়ে উঠলো মিশু। জাইমার উদাস ভাবও কেটে গেছে মিশুর উত্তেজিত মুখ দেখে।
-ওর আসল নাম খোকন সেলিম। চরমপন্থীদের একজন ছিলো। পরে ভোল পালটে সরকারী দলে ঢুকে ভদ্রবেশ নেয়। প্রচুর টকা চাঁদা খেয়ে ব্যবসায় নেমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।
-তোমরা সাংবাদিকরা পুরুষ না মহাপুরুষ?! আমি হেডকোয়ার্টার আসছি আধা ঘন্টার ভেতর।

মানুষের সব কিছুই নির্ভর করে তার বিবেক তাকে কিভাবে পরিচালিত করে। আজকে অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন যে টাকা মানেই ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ বা প্রভাবশালী হওয়ার উৎস। উত্তর ঢাকার সদ্য প্রয়াত ও বিদায়ী মেয়র যদিও একজন ধন্যাঢ্য শিল্পপতির স্ত্রী ছিলেন তারপরো তার কাছে ছিলো প্রখর জ্ঞান, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি যা শহরকে সংস্কারে সাহায্য করে। কিন্তু বিদায়ে জেগে উঠেছে অশনি সংকেত। আকবর মুরসালিন নামে যিনি এ শহরের মেয়র প্রার্থী হতে চান তিনি স্বাধীনতার পর থেকে চরমপন্থি, নানা শাসনামলে রং বদল করে হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ।
কাওরানবাজার এলাকায় পৌঁছে সাংবাদিক হাসানের অপেক্ষায় মিশু। ঘন ঘন রেডিয়াম ঘড়ির ডায়াসের দিকে তাকাচ্ছে সে। কাঁধে ব্যাগ প্যাক। ব্যাগে ফ্লাক্স রোপ, রেড টেপ, তার, গান পাউডার বক্স, কয়েক রকমের সার্কিট, বিয়ারিং এবং আরো কতো কি। যেখানে সে পৌছে গেছে জায়গাটা গোপন ও একটা ভবনের ছাদে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই এসে পড়লো হাসান। বিমর্ষ মুখে তাকিয়ে বললো
-যা অবস্থা দেখছি এবার বোধহয় আকবর জিতেই যাবে।
-মেয়র পদে দাঁড়ানোর জন্য কি তাহলে কেউই নেই? যে দু তিন জন প্রচারণায় নামছেন তারা অর্থবলে যতই জোর দেখাক না কেনো এদের অতটুকু জোর নেই ভেতরে।
-কিন্তু এই ধড়িবাজকে তো সরাতে হবে। হাসানের গম্ভীর গলা।
-চিন্তা করছি আমিই না কেনো দাঁড়াই?
-মিশু ভাই আপনার সামনে বিয়ে। তার উপর ফরাজি কন্সোলিডেটেড এর সিইও আপনি।
-সব সম্ভব।
-বুঝতে পারছি না কিভাবে কি করবেন? আজকে যে ইন্টারভিউ দিলো সংবাদ সম্মেলনে।
-আমি না হয় তেমন দেবো। কাল বিকাল পাঁচটায়। ঠিক প্রেসক্লাব অঙ্গনে।

জাতীয় প্রেসক্লাব।
কয়েকশত সাংবাদিক, টিভি রিপোর্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিশু। ফরাজি কন্সোলিডেটেড এর সিইও হয়ে আজ সে ঘোষণা দেবে।
"প্রিয় উত্তর ঢাকা শহরবাসী,
এই শহরের সবচেয়ে ভালো মানুষটা আজ আমাদের পাশে নেই। আমাদের যখন উত্তরোত্তর উন্নয়ন হচ্ছিলো তখনই আমাদের প্রিয় মেয়র আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু আজ শহরকে কে দেখবে? কে এগিয়ে আসছেন? প্রতিশ্রুতি দেবেন যে শহর আগের মতোই উন্নত হতে থাকবে? মশার উৎপাত বা পানি জমে থাকা রাস্তার সংস্কারে কে এগিয়ে আসবেন? বস্তিতে নানা অপরাধ যেখানে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে কে এসব থেকে মুক্ত করবে শহরকে?
আজ আমি আপনাদের সামনে মেয়র প্রার্থী হওয়ার ঘোষনা দিচ্ছি। বলেই মাইক থেকে সরে গেলো মিশু। সাথে সাথে মিশুর চারপাশে ইলিশের ঝাকের মতো সাংবাদিকরা হামলে পড়লো। নিরাপত্তা কর্মীরা সবাইকে সরিয়ে জায়গা করে দিলো মিশুকে চলে যাওয়ার।
"ফরাজি কন্সোলিডেটেড এর সিইও ফারহান ইকবাল মিশু মেয়র পদে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এই লড়াইয়ে আকবর মুরসালিন ও আরো তিনজন প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যাক্তি থাকবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।"
টিভি বরাবর রিমোট ছুড়ে দিলো খোকন সেলিম ওরফে আকবর মুরসালিন। অল্প কিছুতেই ওর মাথা গরম হয়ে যায় এটা ওর সেক্রেটারির জানা কথা।
"ইউ উইল পে এভ্রি পেনি টু ফাইট উইথ মি"

বিতর্ক খুব ভালো একটি প্রাণসঞ্চারক ব্যাপার। এখানে যে কোন বিষয়ে মাথা খাটানোর প্রচুর জায়গা থাকে। দুই বিতার্কিক যখন নিজস্ব যুক্তি উপস্থাপন করেন তখন এর যে গুরুত্ব প্রকাশ হয়ে পড়ে।
অবশ্য আজকের বিতর্ক হচ্ছে উন্নয়ন এবং সংস্কার নিয়ে। উত্তর ঢাকাকে যখন সবকিছু দিয়ে উন্নত করার চিন্তা মাথায় আসে তখন যে কোন প্রার্থী চিন্তা করবেন বাজেটের। কে কত টাকা নগর কর দিবে সেটাও হিসাব করতে হয়।
"আমি আকবর মুরসালিন। এই উত্তরের মেয়র হতে চাই। প্রাথমিক পর্যায়ে বাসা/বাড়ি ভাড়ার সাড়ে সাত থেকে দশ শতাংশ পর্যন্ত নগর কর বৃদ্ধি করবো। নালা, নর্দমা পরিষ্কার, রোড ডিভাইডারে গাছ রোপনসহ আরো অনেক প্রকল্প হাতে নেবো। আশা করছি আপনারা আমার উপর আস্থা রেখেই ভোট দেবেন। ধন্যবাদ।"
"হ্যালো ঢাকা। আমি ফারহান। আপনারা সবাই জানেন আমি ফরাজি কন্সোলিডেটেড এর সিইও। উত্তরের উন্নয়নের জন্য ২৫ কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ করা হবে। প্রতি খাল ও গ্র‍্যান্ড নালাগুলির সংস্কার হবে। মশা মারার জন্য রিপেলার মেশিন বসানো হবে জায়গায় জায়গায়। আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল সড়ক নির্মাণ ও সকল চার লেন সড়ক সংস্কার করা হবে। আশা করছি ভিক্ষুক বলতে এ শহরে কিছু থাকবে না। ধন্যবাদ"
বিতর্ক শেষ হবার পর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মুখোমুখি হলো।
-ফারহান সাহেব ছেলেমানুষি করেন কেনো? অল্প বয়েসে মেয়র হবার স্বপ্ন দেখে কি লাভ? এসব প্ল্যান ফ্যান কোন কাজে আসবে না।
-মেয়র হতে হলে সৎ হতে হয়। গাঁজা হিরোইন এর ব্যবসা করে দাঁড়ালেই মেয়র হওয়া যায় না।
-আপনার কথার জবাব পেয়ে যাবেন ফারহান ওরফে মিশু।
-এক ইঞ্চি ছাড় দেবো না আমিও। মেয়র আমাকেই হতে হবে।
ক্রুর চোখে তাকিয়ে থেকে আকবর বোঝালো মিশুকে যে সে কতটা ভয়ংকর হতে পারে। মিশুর চাউনি ও বলে দিলো যে সে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা রাখে।

পৃথিবীতে যুগে যুগে ক্ষমতার লোভ জেগে উঠেছে মানুষেরই মনে। কারণ যে যত পায় তার চাওয়ার শেয নাই। এক ক্ষমতার জন্য কোটি মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।
তবে মেয়রের ক্ষমতায় যাওয়ার উদ্দেশ্য যে স্বপ্রনোদিত এবং সৎ একথা আমাদের মিশুই বলে দিতে চায়। আকবর মুরসালিনের নীল নকশাকে সে নস্যাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, যদিও এই যুদ্ধে সে জয়ী হতে পারে তারপরও অদৃশ্য যুদ্ধ চলবেই আকবরের সাথে।
সেই রাতে অনেকেই যখন বিতর্কস্থলের মাঝে উপস্থিত ও তা শেষে বাড়ি ফিরছিলো তাদের মাঝে অনেকেই বড়ো উঁচু ভবন যেটা আছে উত্তর ঢাকার, তার চারপাশের ব্যাস জায়গা জুড়ে এক হইচইয়ের আওয়াজ শুনলো।
"ওটা কি। গ্লাস ভাংলো বোধহয়?"
"হ্যা বিতর্ক যদি প্রার্থীর অনুকূলে যায় তবে বিজয়ীর ব্যবসার ক্ষতি করার চেষ্টা হবে না কেনো?"
আঘাতটা প্রথম আসে ২৫তলার ভবনের একদম গ্রাউন্ড ফ্লোরে। একটা বিশাল বড়ো ডিসপ্লে দশ রাউন্ড গুলিতে নাই হয়ে গেলো। ভবনের সিকিউরিটি ইউনিট যদিও ২৫জনের একটা সেট আপ নিয়ে থাকে তার পরো নিচের তলায় ৩জন যথেষ্ট নয় দশজন দুর্বৃত্তকে ঠেকানোর। ল্যাবকে টার্গেট করে সোজা উপরে উঠছে দশজনের গ্রুপ। এরপর আরো দশেক ওঠা শুরু করলো কর্পোরেট ফ্লোর লক্ষ্য করে।
২২ জনের নেতা বিষয়টি বুঝতে পেরে কমান্ড দিতে শুরু করলেন।
"নাম্বার টেন, থার্টিন, সিক্সটিন কাভার দ্য ল্যাব।" ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন চীফ। "ওরা আক্রমণ শুরু করেছে।"

ফরাজি কন্সোলিডেটেড এর বিশাল বিল্ডিংটা ভুতের ছায়ার মতো যেনো গিলে রেখেছে। আধো অন্ধকার ভেদ করে একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো ভবনের একমাত্র ল্যাব থেকে। সিকিউরিটি চীফ শুনতে পেলো এই আওয়াজ। ল্যাবে কেউ থাকার কথা না। তার পরো কেনো এই ধরনের শব্দ ভেসে আসলো বোঝা গেলো না।
আওয়াজ আসলে প্রথম ১০ জন দুর্বৃত্তেরর একজনের। যাকে ল্যাবে ঢোকার সময় আক্রমণ করে বসে সম্ভাব্য মেয়র ফারহান ওরফে মিশু। আগ্নেয়াস্ত্র বলতে কিছুই নেই মিশুর। ফ্লাক্স রোপ, ম্যাগনেট শ্যু, মুখোশ, একজোড়া মেটাল পলিশ দেয়া রড স্টিক, কয়েক জোড়া শক নিউট্রিলাইজার গান।
প্রথমটা ঢুকতেই সে দমাস করে পেটে ঘুষি চালালো। ভেতর থেকে এমন আক্রমণ আসছে দেখে সতর্ক করলো দলের নেতা। পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছোড়া হলো। মিশু অবশ্য দরজার সাথে থাকা সলিড পিলারে লুকিয়ে পড়াতে রক্ষা পেলো। কিন্তু দরজার লক ঝাঁঝরা হয়ে গেলো।
ল্যাবের ভেতরটা অন্ধকার। গুলি বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ, এদের দরকার ফর্মুলা। এই ফর্মুলা উল্টিয়ে দিলে শহরকে কব্জা করে রাখা যাবে। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে পড়েছে নয় জনই। কালো বিড়ালের মুখোশ পড়াটা নেতা; হাতে জোড়া ম্যাচেটি নিয়েছে। শ্রবণ শক্তি এতো প্রখর যে মিশুর রড স্টিক নিঃশব্দে তার মাথার উপর আসাতে ম্যাচেটি দুটো দিয়ে প্রতিহত করলো।
"ঠাং"!!!!!

আজকে মিশুর পাশে কেউ নেই। একা একা লম্বা ফরাজি টাওয়ারের অন্ধকার ঘরগুলোতে আতাতায়ীদের থেকে গা বাঁচিয়ে চলছে নিজেকে। একটু আগেই দুটোকে আধমরা করে ফেলেছে সে। ছয় জন বাকি আছে। চোখে নাইটভিশন গ্লাস তার।

একটা ট্রিক খাটালো সে। দুটো রিভলভার এর বুলেটগুলো খুলে গান পাউডার লাইন দিয়ে দরজার সামনে রাখলো। রুমের এক কোনায় একটা হলুদ বাল্ব ছিলো। ওটা খুলে মুখ ভেঙ্গে ওয়্যারিং করে একদম পাউডার যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেখান নিয়ে রাখলো। এরপর একটা ট্রিগারিং সুইচ বানিয়ে বৈদ্যুতিক সংযোগ আর দরজার নবের মাঝখানে একটা বুবি ট্র‍্যাপ তৈরি করলো।

আস্তে করে রুমটা থেকে বের হলো। কিন্তু এমন ভাবে বের হলো যাতে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ হয় "ধাম"! ছয়জনই দৌড়ে এলো আতাতায়ীদের।

প্রথমজন নব ঘোরাতেই ক্লিক করে আওয়াজ হলো। কেউ চিৎকার করে উঠলো 'না'!



'ব্লাম' করে বিস্ফোরণ ঘটতেই ছয়জনই ভুমিশায়ী হলো। মিশু ততোক্ষণে ভবনের নীচ তলায়। রিপ্লেস হওয়া সিকিউরিটির পাঁচজনই মিশুর দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে। তাদের নির্বাহী প্রধান বাদাম চিবোতে চিবোতে বাসায় যাচ্ছেন।


একটা সেইফ হাউজে উঠেছে মিশু। জানে তার বাড়িতে হা,অলা হতে পারে। তাই হাসমান ফরাজি, জাইমা ও তার হবু শ্যালক্কে নিয়ে উঠেছে সেইফ হাউজে। যদিও মনে হচ্ছে পেছনে ফেউ লেগে আছে তারপরো এই সেইফ হাউজকে নিরাপদ মনে হচ্ছে। বিশেষ নিরাপত্তার চাদর দিয়ে ঘেরা আর আন্ডারগ্রাউন্ড রুম আছে।



কিন্তু তারপরো প্রশ্ন থেকে যায়। যেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের উপরও হামলা হয় সেখানে মেয়র প্রার্থী মিশু তো কোন ছার! একটা ক্যাপ মাথায় দিয়ে বেরুলো মিশু। কাধে ব্যাগ, হাতে লুকনো ইলেক্ট্রিফায়েড গান। রাতের অন্ধকার ভেদ করে সরু আলো এসে পড়ছে গাড়িঘোড়া থেকে। বিশাল বিশাল লরি ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যস্থলে। একটা লরি চিনতে পারলো মিশু। মুরসালিনের। ফ্লাক্স রোপ ইউজ করে উঠে গেলো তাতে। আস্তে আস্তে দরোজা খুলে ঢুকলো ভেতরে। ভেতরে। যা দেখলো তাতেই চক্ষু চড়কগাছ!

ফোন করা শুরু করলো ডি টাওয়ারে।

ঠিক এমন সময়ই গাড়ি থেমে গেলো। সুযোগ বুঝে মিশু নেমে গিয়ে রাস্তার পাশে ঝোপে আড়াল নিলো। দেখলো একটা ছয় ফিট লম্বা লোক গাড়ির পেছনে এসে দাঁড়িয়ছে। আস্তে করে মোবাইলের ভিডিও ক্টাযামেরা অন করে ভিডিও করতে লাগলো মিশু।

ভিডিও শেষ হতেই মেসেজ করে দিলো ডিজিএফআই সদর দপ্তরে।



এবার খেলা জমবে... 
 ৯. সেফ হাউজ থেকে একশ গজ দূর হবে। পা বাড়িয়েছে মিশু। এমন সময় বুডা বুডা বুডা ঠা ঠা করে কয়েক জায়গা থেকে গুলি আসতে লাগলো। পায়ের সেফটি রকেট প্রপেলার অন করলো মিশু। স্যাটেলাইট ভিত্তিক ভিউগ্লাসটা চোখে লাগাতেই টার্গেট দেখতে পেলো সে। চার কোনা থেকে, চার বাড়ির ভেতর থেকে অনবরত গুলি ৃষ্টি হচ্ছে। রকেট স্যুট ততোক্ষনে উঠে গেছে মিশুকে নিয়ে উপরে। মিনি এক্সপ্লোসিভ লাঞ্চার প্যাডে হাত দিয়েই টিপে দিলো।

বুম!

চারজন শেষ। এরপর হাটতে শুরু করতেই চারদিক থেকে দপাদপ করে লাইট জ্বলে উঠলো

"বাহ বাহ! আমাদের মেয়র পদপ্রার্থী একজন ভিজিলেন্টি! প্রহরী গিরি করছেন! দেশের সেবা করছেন।" মুরসালিনের মুথেকে অনেক জোরে শোনা গেলো একথা।
"ইট'স টাইম ফর উর ফল মুরসালিন"
"পে মি হায়ার"

ক্লিক ক্লিক! সবকটা পিস্তল তাকিয়ে রয়েছে মিশুর দিকে। আজকে বোধহয় জীবনের শেষ রাত।


এক প্রস্থ ভাবলো মিশু। যদি এমনই হয় তাহলে সবার বিরুদ্ধে একা লড়তে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। বাম পায়ে ভর করে ডান দিকে চোখ বন্ধ করে লাথি চালালো। আর বাম দিকের জনকে ঘুষি দিয়ে বসলো। এমন সময় মুরসালিন এগিয়ে গিয়ে মিশুর মুখোমুখি হয়ে গেলো।

হঠাৎ সব কিছু স্থবির।
"মিশু মারতে থাকো। আমি বাকিদের দেখছি।" নতুন কাউকে দেখে মিশু মাথা নেড়ে মুরসালিনের বরাবর লাফ দিলো। মুরসালিন ঘুষি বাগানোর আগেই মিশুর গোটা কয়েক আপারকাট খেয়ে ধরণীতলে ভুপতিত হলো মুরসালিন।

পুলিশ সব কটাকে গ্রেফতার করছে। মিশু এজেন্টসদের সাথে কথা বলে নতুন আগন্তুকের সামনে দাঁড়ালো।
"আমি সময় বন্ধক। আজকে এতোগুলো লোকের সাথে স্যাটেলাইট ভিউতে তোমাকে লড়তে দেখে চলে এলাম।"
"আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো। আমার টিমে চলে আসুন না। আপনাকে দরকার হবে।"
"অবশ্যই।"


ভোরের আলো ফুটছে। ফুটতেই হবে। না হলে যে সত্য ঢেকে যাবে অসত্যের আবরণে।

Post a Comment

Previous Post Next Post