বল্লম স্কোয়াড || pdf

১৬০০ সাল। ঈসা খাঁর মৃত্যুর বছরখানেক বাদে। মুসা খাঁ মুঘল শাসন অস্বীকার করে এখানে সেখানে প্রতিরোধ করছেন। হঠাৎ করে খবর পাওয়া গেলো তার শাসন এলাকার এক জায়গায় রাতারাতি মাটি উধাও। কি হলো কি হলো? এরপর থেকে ব্যারাকের সৈন্য খোয়া যেতে লাগলো। 
-এসব কি শুনছি সেনাপতি? 
-গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। আমি নিজেও এই ঘটনা শুনে অবাক হয়ে পড়েছি। তবে আমি সর্বপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কি করে এটার সুরাহা করবো। 
-আমি গত রাতে অদ্ভুত আলো দেখেছি। অদ্ভুত সবুজ আলো। 
-এই আলোর কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে হুজুর। জনমনে আতংক বিরাজ করছে। 
-আমি চাই এর সুরাহা হোক। 
সেই বৈঠকের দুদিন পেরিয়ে গেছে। তার চেয়ে বড় কথা নিখোঁজদের পরিবারে হাহাকার চলছে। মুসা খাঁ স্বশরীরে গিয়ে দেখা করে আসছেন তাদের সাথে। কিন্তু কেনো এমনটি হলো? কেউ বুঝে উঠতে পারছেনা। 
-হ্যা শুনেছো হুজুর আশ্বাস দিয়ে গেছেন যার যার ঘরের কর্তা ফেরত আসবেই। 
-বললেই হলো? এসব মোঘলদের কান্ড-কীর্তি। হয়তো বুঝিয়ে সুঝিয়ে দলে ভিড়িয়েছে, মোঘলরা শাসনে আসলে মোটা বেতন দেওয়া হবে। বুঝে নাও এরা নাও আসতে পারে। 
-এরা সব দেখি নেমকহারাম। 
-হবে হয়তো... কিন্তু এমন না। আসলে এমনটা হওয়ার কথা না। মোঘলরা তাদের যে পরিমাণ জনবল নিয়ে যুদ্ধ করতে পারে তার জন্য দলে অতিরিক্ত লোক ভেড়াবার কোন দরকারই পড়ে না। তাহলে গর্ত কিসের? ওইযে বিশালাকার গর্ত সোনারগাঁ সেনানিবাসের পাশে? কাজটা আসলে অন্য কারো। সে কথা না হয় বোঝা যাবে আস্তে আস্তে। এখন আপাতত চলমান পরিস্থিতিতে ফেরা যাক। 
বৈশাখের তপ্ত রাত। জামাল মুররানী বল্লম সেনাদের প্রধান। সেনারা ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা দেখার জন্য ঢুঁ মেরে দেখছেন প্রতিটা ঘরে। হঠাৎ ঘড় ঘড় শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকালেন। পাশের ফাঁকা জায়গা দিয়ে কি যেনো উড়ে চলে গেলো। মাটিতে বসে পড়লেন। হামাগুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে এপাশ ওপাশ তাকাচ্ছেন। খপ করে কি যেনো তার মুখ চেপে ধরলো। 
-শশশ... -উ...উ... মাথার উপর থেকে মুখোশটা খুলতেই নিজেকে যেনো আবিষ্কার করলেন একটা চিড়িয়াখানায়। মানবাকৃতির কিন্তু মুখে লম্বা নল লাগানো চিকন গালের কিছু নীলচে রংয়ের প্রানী হাটাহাটি করছে। এসব দেখে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেন না জামাল মুররানী। জ্ঞান হারিয়ে বসলেন। 
-জামাল। অদ্ভুত গো গো শব্দে কে যেনো ডাকছে। এ কি মুসা খাঁ নাকি?! 
-হুজুর। 
-আমি তোমার হুজুর নই জামাল। ওঠো। মুখে কে যেনো আলতো চাপড় দিয়ে দিলো। ধড়মড় করে জেগে উঠলো জামাল। একটা গোলমতো কাচঘেরা জায়গায় রয়েছে সে। সবুজ কিছু আলো ছোট ছোট হয়ে উপর থেকে স্নাত হচ্ছে। অদ্ভুত কিছু জিনিসপাতি দেখা যাচ্ছে। হাতল গোছের কিছু একটার উপর হাত রেখে সামনে পেছনে আনছে একটা নীলচে প্রাণী। তার দেহের আয়তন বিশাল অন্যান্যদের থেকে। 
-আমি নাফুয়াস। ভবিষ্যত থেকে আসা মহাকাশচারী। আগে নিটসন নামের এক গ্রহের অধিবাসী ছিলাম। আমাদের স্বজাতির এক গোত্রের বেইমানির কারণে আমাদের গ্রহ ধ্বংস হয়ে যায় যার কারণে আমরা গ্রহান্তর হয়ে তোমাদের এখানে এসেছি ভবিষ্যত থেকে। -আচ্ছা। তা আমাকে এখানে ধরে আনার মানে কি? 
-তোমার সেনাদের উপর কিছু পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। কাজ শেষ হলে আবার ছেড়ে দেয়া হবে। 
-কিসের পরীক্ষা? এসব কি বলতে চান? -আমরা ভিনগ্রহে লক্ষাধিক বছর জুড়ে বসবাস করে আসছি। কিন্তু তোমাদের গ্রহে, বিশেষ করে এই অঞ্চলে এসে আবিষ্কার করলাম তোমরা অত্যন্ত বোকা প্রজাতির প্রাণী। 
-খামোশ!! মুখ সামলে কথা বলো। তুমি জানো আমরা কত রাজ্য শাসন করি?!! স্বয়ং হুজুর মুসা খাঁ; কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা অত্যন্ত সফলতার সাথে শাসন করছেন। 
-আমি বলতে চাচ্ছি বিজ্ঞানে ও শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে আছে। নাফুয়াস বললো। 
-হুম বুঝলাম। 
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। নাফুয়াস কমান্ড দিচ্ছে তার আর্মিকে। বীপ বীপ। 
-কে সংকেত দিচ্ছে? দেখো। নাফুয়াস নির্দেশ দিলো তার এক সহকারীকে। 
-একবিংশ শতাব্দী থেকে ডঃ আলফরাজ। 
-ও ফিউচার সায়েন্টিস্ট। অন করে কথা বলো। 
-হ্যালো নাফুয়াস। গট ইউ। 
-হ্যালো ডঃ। প্রথম কথা হচ্ছে তাহলে? 
-হুম। তোমার জেনারেশনের সাথেই ইন্টারেকশন বেশি হচ্ছে। 
-তুমি কতো সালের, কতো শতাব্দীর? 
-দুই হাজার একশ পঞ্চাশ সাল। 
-ওরে বাবা এতো নিয়ার অ্যাবাউট, সমকালীন। 
-হুম। তোমার ওখানে দেখছি মুঘল আমলের বাংলার বল্লম ট্রুপ রয়েছে। 
-ডঃ তুমি অবজারভ করছিলে আমাদের?!! এইটা কি গুপ্তচরবৃত্তি না অন্য কিছু। 
-আমার একটা প্ল্যান ছিলো। 
-বলো?! 
-এভাবে না। আমি আসছি। 
-আসছি মানে?!তুমি কি এখানে ফিউচার টেলিপোরটিং করবে? 
-হ্যা। জাস্ট ওয়াচ মি অ্যালাইভ। হঠাৎ করেই লাফিয়ে পড়লেন বিজ্ঞানী। রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন। কয়েক বিলিয়ন ঘন্টা পিছিয়ে এসেছেন ব্ল্যাকহোল দিয়ে। স্বভাবতই পালস রেট হাই হওয়ার কথা এই ফিউচার করিডোর দিয়ে আসার সময়। উত্তেজনার চোটে চোখ যে সেই বন্ধ করলেন আর খুলছেন না। 
-ডঃ, ডঃ। 
-হ্যা...হ্যা?! 
-হ্যাভ আ ড্রিংক। 
-আহ শান্তি। 
-এখন বলো প্ল্যান কি? 
-এদের মেটাহিউম্যান বানানো হবে। 
-মেটাহিউম্যান বানিয়ে কি লাভ? 
-২০১৬ এর সময়ে বাংলাদেশ ভীষণ বিপদে পড়ে যাবে। অভ্যন্তরীন সন্ত্রাসে জর্জরিত হয়ে বাংলাদেশ এর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে। 
-হুম এখন কি করা যায়? 
-আমার সময়ে মেটাহিউম্যান এর শিডিউলিং করা আছে। এতো টাইট যে এদের কোনোভাবেই এই প্রসেসে নেয়া যাবে।
-এখন উপায়? -ওই সময়েই প্রবেশ করতে হবে। আই মিন ২০১৫তে ডঃ তানভীর প্রথম জেনারেশন সূচনা করেন মেটাহিউম্যান আর্মির। -তার মানে তুমি ভিশন করেছো ব্যাপারটা? 
-হুম। ডঃ ই পারবেন সেটা। 
-চলো তার কাছে যাই তাহলে। একটা বিশাল ক্যাপসুল মতন সাইজ হবে। আট জন ধারণ করা যায়। 
-এটার জেনারেশন কতো? 
-আমি থার্ড জেনারেশন ফিউচার ক্যাপসুল লিফট। চমকে উঠে তাকালেন আলফরাজ দুটো আলোর দিকে। ক্যাপসুলেরও কি প্রাণ আছে? ২০১৫ সাল। ডি টাওয়ারের দোতলায় তানভীর বসে আছেন যন্ত্রমানবকে নিয়ে। হুট করে করে একজন কিম্ভুতকিমাকার আর একজন বড় গগলস পড়া মানুষ আর পাচজন মুঘল আমলের বল্লমধারী তাদের রুমে ঢুকে পড়েছে। 
-সিকিউরিটি ব্রীচ! যন্ত্রমানব চিল্লিয়ে উঠলেন। 
-ওয়েট ওয়েট! আমি ফিউচারিস্টিক সায়েন্টিস্ট আলফরাজ। এ মহাকাশচারী ধ্বংস হওয়া ভিনগ্রহের অধিবাসীদের নেতা নাফুয়াস। -এদের কোথায় পেলেন? 
-এদের এক্সপেরিমেন্টের জন্য পিক করেছিলাম। নাফুয়াস বললো। 
-তারপর? -আলফরাজ হুট করে এসে বললো আপনাদের হাতে তুলে দিতে। 
-মানে মেটাহিউম্যান বানাতে হবে?! বলেই তানভীর তাকালেন যন্ত্রমানবের দিকে। 
-হ্যাঁ... -বড্ড দুঃসময়ে এসেছেন। এদের দরকার ছিলো। আমাদের একজন আছে যে আঠারোশো শতাব্দী থেকে এসেছে। 
 -রানার?! 
-আপনি দেখি আমাদের সব কিছু জেনে ফেলেছেন। 
-আপনাদের সাহায্যই করতে চাই। 
-ওকে ওদের আসতে দিন আমাদের সাথে। ল্যাবের মাঝখানে পাঁচটা এক্সপেরিমেন্ট বেডে শোয়ানো হয়েছে তাদের। অকুতোভয় পাঁচজন। 
-ডঃ লাইট কসমিক রেডিয়েশন দিয়ে ইনভিজিবল পাওয়ার ক্রিয়েট করা যায় না? 
-এদের পালস রেট নরমাল। এদের মাসল পাওয়ার বর্তমানের মানুষগুলো থেকে কয়েক গুণ বেশি। আমি এদের ইনভিজিবিলিটি পাওয়ারের সাথে আন আর্মড কমব্যাট পাওয়ার ইন্টিগ্রেট করে দিলে ভালো হবে। 
সবুজ বোতাম টিপে দেওয়ার পর পাওয়ার ট্রান্সফরমেশন ইঞ্জিনের ভেতর জোর গুঞ্জন শুরু হলো। এতো জোরে আওয়াজ হলো যে কানে তালা লাগার জোগাড় হলো। “জুইপ”! 
-আরে কই গেলো?! 
ঘন্টাখানেক পর। ঢাকার উত্তর অংশে। এখানে ওখানে ধ্বংসের চিত্র। বিশাল কালো হেলমেট স্যুট পরা একটা অপরিচিত আর্মির মিছিল এসে গেছে। একটা আকাশচারী যান উপরে উড়ছে। 
-প্রিয় ঢাকা! আমি ভবিষ্যত থেকে আসা ইমরোজ। আগামী এক ঘন্টার ভেতর আমার জিল আর্মির লোকেরা হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকবে। প্রত্যেকে এক হাজার করে টাকা দেবে। প্রশাসন দূরে থাকবে। নাহলে সেখানেই বিভীষিকা দেখিয়ে দেয়া হবে। 
জিল আর্মি পিল পিল করে ঢুকে পড়ছে ভেতরে। প্রত্যেকটা জায়গায় অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু অসহায় তারা। কিছু করতে পারবে না। হুট করে সন্ত্রাসী জিল আর্মির একজন গুলি করে বসলো কয়েকজনকে। সেখান থেকে ফিরে পেছনে তাকালো সামনের দিকে। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই আঁতকে উঠলো একজনকে বল্লম হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তার পেছনে একই রকম দেখতে চারজন দাঁড়িয়ে আছে। স্বচ্ছ কাচের ন্যায় অথচ অদ্ভুত শক্ত উপস্থিতি! দেখে দৌড়ে এলো আর্মির কয়জন। ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। বল্লম সেনানীদের নেতা মুররানীর বল্লম ঢুকে গেছে জিল আর্মির সেই লোকটার বুকে যে কিছুক্ষণ আগে কয়েকজনকে খুন করেছে। আহত অবস্থায় মৃত্যুপথযাত্রী লোকটি ভয়ানক বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে বল্লম হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মুররানীর দিকে। 
-কে...কারা তোমরা? 
-আমরা “বল্লম স্কোয়াড”...

Post a Comment

Previous Post Next Post