এক.
ফোরথ ডাইমেনশন ব্রেক করে যে কোনো গ্রহে কি যাওয়া সম্ভব? টাইম ট্রাভেলিং এর কথাও কিছুদিন আগে সরব হয়েছিলো। ২০৪০ সাল থেকে এক সময় পরিভ্রমণকারী এসেছিলো আমেরিকায়। আমি মোটামুটি বলতে পারি আমাদের অদূর ভবিষ্যৎে এমন দিন আসবে আমরা জরুরি প্রয়োজনে দুই তিন প্রতিবেশি গ্যালাক্সিতে ঘুরে আসবো আগামী ১০০ বছরের ভেতর।
যাই হোক, তৃতীয় পৃথিবীর কথা বলতে গেলে অনেক কথাই আসে। এখানে একক রাজতন্ত্রের প্রভাব আছে। এর ভেতর মহানায়কদের অভাব নেই। এর ভেতর রাষ্ট্রবিরোধী, তোষামোদকারী সবই আছে। কিন্তু একনায়কতন্ত্র যেভাবে কায়েম তাতে দেশের সকল মতো মহানায়কেরা রয়েছেন তার বিপক্ষে। আবার, সরকারের বিপক্ষে কথা বলতে পারেন না।
একজন রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকা পালন করতে যতোটুকু সামর্থ্য দরকার তার বেশিরভাগই আছে যুবরাজ দ্রাগার কাছে। দ্রাগা জানেন অদূর ভবিষ্যৎ তারই। এরপরও তিনি কঠোরভাবে রাষ্ট্র তথা পুরো গ্রহ শাসন করে চলেছেন অতীতের সকল রেকর্ড ভেংগে। অসুস্থ বাবার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে আজ অব্দি ১৩ বছর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন বিশ্বজুড়ে। তার সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে অতিমানব কমান্ডো ফোর্স, সুপ্রীম ফোর্স অফ ডি এর সাথে। এলায়েন্স থেকে বেরিয়ে গেছেন গার্ড অব দ্য নেশন- যন্ত্রমানব, সুপ্রীম রানার ইরফান, নাইট অব ক্যাপিটাল- রাতের প্রহরী। এদের কথা আজ না হয় নাই বললাম। আজ গল্প বলবো শোষণের হাত ভেংগে দেওয়া দুই বীর ও বীরঙ্গনার কথা।
একটানা অঝোর বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে সাভার এলাকা। কারখানায় লোহা গলানোর জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে তাহান। তাকে আদেশ দেয়া হয়েছে সামনের লোহার স্তুপ আগামী এক ঘন্টার মধ্যে গলিয়ে একেবারে লেভেল করার। প্রহরী বাইরে থেকে লক করে সিটে বসে রয়েছে। তাহান চারপাশ দেখে চুল্লিটা জ্বেলে নিলো এক অন্যরকমভাবে। হাত থেকে তার নীলচে আগুন বেরুলো। চুল্লিটাতে আগুন লাগলো। কাজ শুরু হলো। ঘন্টা দুয়েক কাজ হচ্ছে। প্রহরী জানেনা যে ভেতরে কি চলছে। জানলে তাহান রেহাই পাবেনা। অতিমানবীয় শক্তি ব্যবহার করে যে কোনো ধরণের কাজ করা দন্ডনীয় অপরাধ।
একটা সময় প্রহরীর মনে হলো একটু চেক করে দেখা দরকার। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢোকার পর স্তব্ধ হয়ে গেলো প্রহরী।
-অ্যাই! এসব কি?! বে আইনি! হাত ওপরে তোলো।
তাহানের মনে হলো তার পায়ের নীচ থেকে জমিন সরে গেলো।
দুই.
নাম- নীহারিকা। পুরো নাম তৃষা শবনম। গ্রহের রাজবাড়িতে আজ দুদিন হলো সরকারী ছাপোষা এক পদে নিয়োগ হয়েছে। তার দ্বায়িত্ব পড়েছে মহাকাশ বিষয়ক উপদেষ্টার সহযোগী হিসেবে কাজ করার। এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার কারণে মনিবের নেক নজরে নাকি বদনজরে পড়ে তা দেখার বিষয় বটে। তবে উপদেষ্টা যে দুশ্চরিত্র নন হলফ করে বলে দিতে পারবে তাঁর আশেপাশের লোক। তবে তাঁর আশেপাশের মানুষজন ভালো নয়। দাপ্তরিক কাজে যারা বহাল তার নয়। বরং বাইরে থেকে দেন দরবার করতে আসা লোকজনই এমন।
এই যেমন মহাকাশে ভ্রমণযোগ্য দুই সিটারের স্কেলোশীপ তৈরির ঠিকাদারি নেয়া আয়নাল। হারামজাদা নোংরা কৌতুক করে। উপদেষ্টার সামনে বিশ্রিভাবে এই মেয়েটা কে, নতুন নাকি এধরনের অবান্তর প্রশ্ন করে বিব্রত করছে নীহারিকাকে। সন্ধ্যার ছুটির পর বিশাল ফটক পেরিয়ে বেরোতেই নীহারিকার কেমন যেনো খটকা লাগলো। মনে হতে লাগলো কেউ যেনো তাকে অনুসরণ করছে। দু মিনিট পেরোতেই সন্দেহ তীব্রতর হতে লাগলো। দুটো মানুষকে দেখা গেলো। এদের একজন আয়নাল। হুট করে পেছন দিকে দৌড় দিলো নীহারিকা, আয়নাল বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা দৌড়ে অফিসে ঢুকলো। "শ্রিংক-কনফিডেন্সিয়াল" লেখাটা দেখে ঐ রুমটাতেই ঢুকে গেলো। এদিকে আয়নাল খুঁজে সার। রাজবাড়ীতে তার ভি আই পি এক্সেস আছে। আর অনেক নির্জন কামরা।
দৌড়ে ঢুকতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লো এক যন্ত্রের উপর। এরপর দেখলো নিজের আকার ছোট হতেই চলেছে। মাথা ঘুরে উঠলো। এরপর আর মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আবিষ্কার করলো নিজেকে যন্ত্রটার পাশে। আকারে ছোট হয়ে গেছে তার শরীর। উঠে দাড়াতে গিয়ে আবিষ্কার করলো সে আর মাটিতে নেই। বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারছে।
এহেন অবস্থায় নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলো না নীহারিকা। এতো বড়ো অদল বদল দেখে নিজের গায়ে চিমটি কাটলো সে। না ঠিকই আছে। নিজের আকার প্রয়োজনে ছোট করে বেরিয়ে এলো সে। বাতাসে ভেসে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। উপরে আকাশ পানে ছুটলো। রাডারে ধরা পড়লো সেটা। ছোট কিছু একটা অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে উপরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। এবার নিজেকে বড় করতে লাগলো মহাকাশে এসে। আবার ছোট হলো নিজের প্রয়োজনে। নামছে সে। হঠাৎ মনে হলো তার শরীরে খিচুনি দিচ্ছে। এরপর মনে নেই।
তিন.
দুঃস্বপ্ন। তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাহানকে। স্থানীয় সরকারের রক্ষীবাহিনীতে পরোয়ানা জারি হয়ে গেছে তার নামে। লুকায়িত শক্তির নিবন্ধন না করার কারণে সরকার তাকে খুজে বেড়াচ্ছে। আজকের ঘটনায় কারখানা থেকে সোজা উড়ে কুমিল্লার দিকে চলে এসেছে। তাহানের অসম্ভব দ্রুতগতি, আনবিক ও উড়তে পারার শক্তি তাকে প্রচন্ড শক্তিশালী করে তুলেছে। রাতে যখন উড়ে আসছিলো তখন তার শরীর থেকে আলোর বিচ্ছুরণ বন্ধ রেখেছিলো।
ময়নামতির এক কোনায় নেমে লুকিয়ে পড়েছে। শক্তি খরচ হওয়াতে ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ থুপ করে আওয়াজ হলো। চোখ খুলে দেখে হাতের আঙুলের সাইজে এক মেয়ে তার বুকের উপর পড়েছে। ভয়ে লাফ দিয়ে উঠলো।
-কে...কে আপনি?
-নীহারিকা। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো।
-এখানে, কিভাবে এলেন?
সব খুলে বলার পর থেকে এক চিলতে হাসি দেখা গেলো।
-তাহান আমার নাম।
হঠাৎ কিসের যেনো আওয়াজ শোনা গেলো। সে আওয়াজ শুনে তাহান উঠে দাঁড়ালো। হাতে নীলচে আলো জ্বলে উঠলো। নীহারিকা সিধে হয়ে গেলো।
-তুমি অতিমানব?
-হ্যাঁ।
-এটা কি শক্তি?
-মলিকিউল স্প্লিটার এনার্জি।
-বাপরে তোমার তো নতুন নাম দেয়া উচিৎ।
-যেমন?
-অণুমানব।
পাহাড়ি এলাকা ঝোপঝাড় বেশি। চাদের আলোয় জায়গাটা ভয়ংকর লাগছে। আওয়াজটা বাড়ছে। হঠাৎ অণুমানবের গায়ের উপর কি যেনো এসে পড়লো। প্রচন্ড ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো সে। যন্ত্রণায় ছটফট শুরু করলো। নীহারিকা চিৎকার করে দৌড়ে গেলো সেদিকে। কাছে গিয়ে দেখা গেলো গ্লাসের হেলমেট, পুরো শরীর হেভি মেটাল আর্মর দিয়ে মোড়ানো।
-ইউ আর অ্যারেস্টেড।
-মোটেওনা। নীহারিকা রাগের সাথে লোকটার উপর ঝাপিয়ে পড়লো। অনবরত মারতে মারতে তার গ্লাস প্রোটেকটেড শীল্ড ভেঙ্গে পড়লো।
চার.
-কান্দার! অণুমানব তাহান বললো।
-হ্যা! আমি কান্দার!
-ওয়েট! তোমরা চেনো একে অপরকে? নীহারিকা অবাক হয়ে বললো।
-ছিহ! বন্ধু হয়ে বন্ধুকে আক্রমণ। আজ এই মুখোশ না ভাঙ্গলে বোঝাই যেতো না।
আধাঘন্টা কোনো কথা নেই তাদের মধ্যে। ডিস্ট্রেস সিগন্যাল দেয়া শুরু করলো কান্দার। প্রথমে নাইট অব ক্যাপিটাল- রাতের প্রহরী ওরফে মিশু, তারপর যন্ত্রমানব, শেষে সুপ্রীম ফোর্স ডি।
যন্ত্রমানব এসে গম্ভীর মুখ করে ফেলেছেন।
-মানুষের অতিমানবীয় শক্তি থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
-স্বাভাবিক না যন্ত্রমানব, এটা অধিকার। মিশু বললেন।
-কিন্তু আমি কি জবাব দেবো। আর এরা কি বিচার চাইবে বলুন মিশু ভাই?
-গোড়ার গলদ মুছতে চাইলে ওদের দুজনকেই যেতে হবে সেখানে। ওরা মুখোমুখি হোক। সুপ্রীম ফোর্স ডি এর কমান্ডার এজেন্ট শরীফ বললেন।
পরপর ৪৩টা ডিসট্রেস কল আসছে কান্দারের কাছে। সুপ্রীম জেনারেল করছেন। কান্দার ধরছে না। তার এখন মাথায় শুধু এ দুজনকে নিয়ে যাওয়া সেফ হাউজে। রাত চারটায় রওনা দেওয়া হলো। সকাল ছয়টায় পৌছে দেওয়া হলো। টানা ছয় ঘন্টা ঘুমিয়ে দুপুর বারোটায় উঠলো তারা ঘুম থেকে। ট্রেনিং প্যাডে টানা চার ঘন্টা নিজের শক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং মার্শাল অার্ট বেসিক শিখিয়ে দেয়া হলো।
-আমার যেতে হবে। তোমরা ঠিক চারটায় কাজ শুরু করবে। বলে সে চলে গেলো।
নীহারিকা তাকিয়ে আছে তাহানের দিকে। কতো নিখুঁত হতে পারে একটা মানুষ। হুট করে ঘাড় ফেরালো তাহান। ফিক করে হেসে দিলো নীহারিকা।
-কি দেখছো?!
-দেখছি না। ভাবছি।
-কি ভাবছো?!
-একটা মানুষ নির্লিপ্ত হতে পারে। কতোটা?
-আমি তো অমন না। আমারও তো মন আছে। হৃদয় আছে। হৃদয় নদী। শুনবে সেখানে কতো খরস্রোতে বয়ে চলে ধমনী?!
-কাছে এলো নীহারিকা। বুকের আরো কাছে। বুকে কান পাতলো। সেখানে নদী নয়। মনে হলো ভালোবাসার এক বিশাল মহাসাগর আছে।
পাঁচ.
কান্দার যখন হেডকোয়ার্টার পৌঁছালো তখন সন্ধ্যা নেমেছে। গম্ভীর মুখে সুপ্রীম জেনারেল বসে আছেন। স্যালুট করে কান্দার সামনে এসে বললো, "দেশের জন্য"। চোখ তুলে তাকালেন জেনারেল। লাল হয়ে আছে। কান্দার বুঝতে পারছে সে চোখের ভাষা।
" ইজ দ্যাট গুড ফর ইউর কান্ট্রি হোয়াট ইউ আর ডুয়িং?"
-হোয়াই নট সুপ্রীম?
-তাহলে বলো ড্যামিট! আমার ৫০টা ডিসট্রেস কল পেয়েও রিসিভ করো নি কেনো?!
-আ..আমি ওদের হারিয়ে ফেলেছিলাম।
-খামোশ! তুমি আমার সোলজারদের ভেতর সবচেয়ে দক্ষ এবং চৌকস!
চুপ হয়ে গেছে কান্দার। জানে এখন না বলাই উচিত। আধাঘন্টা পার করলো বকা খেয়ে। এরপর গেলো নিজের কেবিনে। ঠিক আটটায় সুপ্রীম কোয়ার্টারে প্রবেশ করলো অনুমানব ও নীহারিকা। দুজন গার্ড পরিচয় জানতে চাইলে তাহান বললো সে যুবরাজের সাথে দেখা করতে চায়। মুহুর্তে সচল হয়ে উঠলো ইন্টেলিজেন্স। তাহানের ভয়েস রিকগনিশন ধরা পড়লো। সাথে সাথে গার্ড অস্ত্র তাক করলো। শ্রিংক মানে ছোট হয়ে গার্ডদের উপর আক্রমণ চালালো। টপাটপ পড়ে গেলো। হাটা শুরু করলো সুপ্রীম জেনারেলের দিকে। সিসিটিভিতে জেনারেল সবই দেখেছেন। হেভি মেশিনগান তাক করে ধরা হলো তাহানের দিকে। লাউডস্পিকার চালু হলো।
-দাড়াও। যেখানে আছো সেখানে থাকো। নড়লে গুলি চলবে।
তোয়াক্কা করলো না অণুমানব। হাটা শুরু করলো সেদিকে।
ঠা-ঠা-ঠা। গুলি চলছে। সবাই হা হয়ে গেলো। কজন এগিয়ে এলো তাহানকে আঘাত করতে। কিন্তু নীহারিকা সাইজে ছোট হওয়ায় উল্টো মার খেয়ে পড়ে গেলো তারা। ভয়ংকর শাওলিন আর উইং চুনের সমন্বয়ে কুপোকাত হয়ে গেলো।
-জেনারেল প্লিজ। তাহান হুংকার দিয়ে বলে উঠলো- আমরা আপনার কোনো ক্ষতি করবো না। আমাদের কথা শুনুন।
বলেই দেখলো বিশাল বপু শরীর নিয়ে সুপ্রীম জেনারেল বেরিয়ে এলেন।
-আমি এহতেশাম। বলো কি চাই তোমাদের?!
বোঝানোর পর জেনারেলের মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো।
-চলো।
দেখানো পথে রাজ প্রাসাদে ঢোকার পর যুবরাজ দ্রাগার মজলিশে এলো তারা। তাহান হঠাৎ চমকে উঠলো।
-ইনি... ইনি তো যুবরাজ নন।
-কি আবোল তাবোল বকছো?
কাছে গিয়ে লোকটার মুখের সামনে আলট্রা রেডিয়েশন প্রসেস আনলো তাহান। মুখোশ গলে যা দেখা গেলো তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। এযে কুখ্যাত সন্ত্রাসী সলিম শেখ! যুবরাজকে মেরে গুম করে রেখেছিলো আসল ব্যাপার এটাই। রাজমাতা চোখের জল ফেললেন কিছুক্ষণ।
-আমার একমাত্র সন্তান যে ছিলো তাকে তো মেরে ফেলা হলো।
-সমস্যা নেই। আমি আছি না? তাহান কাছে এলো। আমারও তো মা নেই।
পর মুহুর্তেই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হলো। রাজমাতা জড়িয়ে ধরলেন অণুমানবকে।
-আজ থেকে তুমি আমার ছেলে।
-আর আমি?!
নীহারিকার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো তাহান। সে হাসির ছিলো গভীর অর্থ। তা বোঝা যাবে পরবর্তী গল্পে।