টিক টক। টিক টক। টিক টক।
দেয়াল ঘড়িটার সাথে টিকটিকিটার কি সম্পর্ক জানা নেই বিজ্ঞানীর। তবে রাত বারোটা বাজলেই নিচের ফ্ল্যাটে গিয়ে বৌ ছেলের সাথে গিয়ে ডিনার করাটা জরুরি কাজ হয়ে যায়। একটা জ্যামার তৈরি করছিলেন যেটা কিনা একসাথে সমস্ত ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতিকে নিমিষেই পংগু করে ফেলতে পারে মুহুর্তেই। বৈশাখের অর্ধেক পেরুনো পিপাসাকাতর পরিবেশ। যেনো বৃষ্টি ঝরলেই শুষে নেবে আর মাটির কয়েক স্তর নিচ পর্যন্ত চলে যাবে প্রবহমান জলস্রোত।
বলছিলাম বিজ্ঞানী সিরাজুল ইসলামের কথা। সাতচল্লিশ এর কোঠায় পা রাখা তারুন্যদীপ্ত এই উত্তর ঢাকার মানুষটা বেড়ে উঠেছেন মিরপুরে। ধন্যাঢ্য বনেদি বংশের ছেলে বলে বাড়ির তেতলায় বানিয়েছেন বিশাল ল্যাব। কখনো কখনো কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলেই ল্যবের ভেতরে ছোট্ট রুমটাতে ঘুমিয়ে পড়েন।
বারোটা বাজতেই সিড়ি বেয়েই নামতে যাবেন হঠাৎ ডাস্টবিনের দিকে চোখ পড়লো। ওটা কি?! মানব দেহ!
"মিনি এই মিনি"
-আ্যই কি হলো চেঁচাচ্ছো কেনো?
-জলদি নীচে চলো!
-আরে কি হলো?! আ্যই শিপলু আয় তো।
নীচে ডাস্টবিনের কাছটায় এসে মুখটা থমথমে হয়ে গেলো সবার। একজন শান্ত সৌম্য উজ্জ্বল দীপ্তিময় চেহারার তরুন। চোখে মুখে অজস্র ক্ষত। বাম পাজরের খাজটায় মারাত্নক ক্ষত, ছুরি দিয়ে অনেক খোঁচানো হয়েছে। সেল ফোনটা হাতে নিলেন মিসেস। ফোনটায় ডায়াল করবেন এমন সময় বাধা দিলেন বিজ্ঞানী।
-করছো কি?
-পুলিস ডাকবো।
-পাগল নাকি? পরের বার খুনিরা হাসপাতালে গিয়ে মেরে আসবে। এখন আপাতত ল্যাবে নিয়ে চলো।
টেস্টিং বেডটায় শুইয়ে দেয়া হলো। মেডিক্যাল ফার্স্ট এইড জ্ঞান আছে ঘরের সবার। আর শিপলুর এক খালাতো বোন মেডিকেল এ পড়ছে বেসরকারিতে। ওকে ফোন করা হলো।
-নাহিদ। জলদি বাসায় আসো।
-জ্বি খালু?
-তাড়াতাড়ি বাসায় আসো।
-কোন সমস্যা হয়েছে খালু?!
-মা একটা সমস্যা হয়েছে। প্লিজ আসো।
খুব দ্রুত চলে এলো নাহিদ। ব্লিডিং বন্ধ হলেও অবস্থা ভালো না। শরীর প্রায় নিস্তেজ। ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে নিলো। গ্রুপ জানার জন্য। বাসায় চলে গেলো।
-এখন? শিপলু জিজ্ঞেস করলো।
-ফার্মেসি যাও। বলবা রোগির পালস রেট অনেক কম। ১ লিটার এর স্যালাইন দিতে। আর লিকুইড কার্বোহাইড্রেট এর ব্যবস্থা করবো তুমি আর আমি। কুইক।
দুই হাতে ডাব আর স্যালাইন দেখে বিজ্ঞানী ছেলের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেলেন। স্যালাইন দেয়া হলো এক হাতে, অন্য হাতে আরেকটি স্যালাইনে ডাবের পানি দিয়ে নাক দিয়ে কন্ঠনালীতে প্রবেশ করানো হলো।
-এখন অপেক্ষা করা যাক। বিজ্ঞানী চেয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। মিসেস আর শিপলুকে ইশারা দিলেন ঘুমাতে যেতে। খুব দুশ্চিন্তায় পড়লেন যে তা না। এই আঘাত যে কোন ছোট খাটো ছিনতাইকারী দিয়েছে তাও নয়। গলার কাছে পোচ আর পাজরের মারাত্নক ক্ষত দেখে বুঝেই গিয়েছিলেন কোন গ্যাং এর কাজ হবে।
এসব চিন্তা করতে করতে যখন ঘুমিয়ে পড়েছেন তার দু ঘন্টা পরের কথা। তন্দ্রায় চোখ ঢুলু ঢুলু এমন সময় আহহহ করে উঠলো ছেলেটা। ঘুম ছুটে গেলো সায়েন্টিস্ট এর। দৌড়ে গেলেন তিনি।
-নড়বে না। একদম নড়বে না।
-আমি কোথায়?
-বিজ্ঞানী সিরাজুল ইসলামের বাসায়। কি হয়েছিলো তোমার সাথে?
-এখন কটা বাজে? আজ পরীক্ষা আছে। আমার প্রোগ্রামিং সাবজেক্ট এর ফাইনাল।
-তোমার পরীক্ষা দিতে হবে না। আমি ফোন করে দেবো। কাল রাতে কি হয়েছিলো? কারা তোমাকে মেরেছে?
-লস আঞ্জেলসের একটা পোকার টিমের সাবসিডিয়ারির আ্যাকাউন্ট হ্যাক করে ছিলাম। ওরা ওদের আইটি এক্সপার্ট দিয়ে আমাকে ট্র্যাকিং করে খুঁজে বের করে এই হাল করেছে।
-আচ্ছা এখন ঘুমের ঔষধ দিচ্ছি। তোমার কিছুটা ঘুম দরকার। তোমার নাম কি?
-হুম? মিশু। যন্ত্রণাকাতর ছেলেটি উত্তর দিলো।
-একটু ব্যাথা করবে। সিরিঞ্জটা ফোটালেন মাংসপেশিতে।
-আহহ! কটা বাজে?
-৭ টা বেজে ১৪ মিনিট।
দুই.
তখন দুপুর। মধ্যহ্নের কড়া রোদে ঝা ঝা চারিদিক। মেঘ দৌড়ে আসছে। ঢেকে ফেলবে হয়তো সূর্যটাকে। সিরাজুল ইসলাম বসে আছেন মিশুর পাশে। চেয়ে আছেন ক্ষতগুলোর দিকে।
-হাহহা!
-আস্তে আস্তে।
উঠে বসলো মিশু। জানালা দিয়ে তাকালো বাইরের দিকে। মেঘ এসে ঢেকে গিয়েছে। আলোছায়ার ভেতর দিয়ে সূর্যকিরণ নেমেছে ধরণীতে।
-আসবেই। আনমনে বলে উঠলো।
-কি আসবে? বিজ্ঞানী বললেন।
- সত্যের আলো। মিশুর কন্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠছে।
-তুমি কি প্রতিশোধের পথে হাটবে?
-আমার সাথে যা হয়েছে তাতে বসে থাকা চলবে না। অনেক কিছু করার বাকি। বিজ্ঞানীর দিকে তাকিয়ে মাথা আবার ঘোরালো।
বিজ্ঞানী অপ্রস্তুত হয়ে উঠলেন। যে কোন পুরুষ প্রতিশোধপরায়ণ। যতই সাধাসিধে হোক না কেনো বদলা নেয়ার প্রকৃতি তার থাকবেই।
-তুমি প্রোগ্রামার তাই না?
-হুম। হ্যাকারও।
-ওরা ক্রেডিট কার্ড হ্যাকের জন্য তোমাকে মেরেছে? নাকি আরো কিছু?
-ওদের বিজনেসের অনেক গোপনীয় তথ্য আমি জেনে যাই।
-কি ধরণের গ্রুপ এটা?
-মব। মাফিয়া। স্মাগ্লিং,নারী পাচার অনেক বড় কিছুর সাথে ইনভলভড।
আরো অনেক কিছু জানতে চাচ্ছিলেন বিজ্ঞানী। কিন্তু কেনো যেনো বলতে চাচ্ছিলো না মিশু। ডিস্ট্র্যাকড করতে চাইলেন না। চিন্তা করলেন কিছুক্ষণ।
-ওকে। তোমার সাথে আছি। টিম ইজ অন।
-টিম? কিভাবে?
-তোমার প্রতিশোধ নিতে যত রকম সাহায্য দরকার আমি দেবো।
-স্বার্থ ছাড়া কেউ কাজ করেনা। আপনার স্বার্থ কি?
-দেশের স্বার্থ।
-ওকে।
দ্রুত আরোগ্য হওয়ার টনিক অনেক আগে বের হয়েছে। তবে এবার বিজ্ঞানী নিজেই কিছু প্রতিষেধক বানিয়ে খাওয়ালেন মিশুকে। নাহিদ সকালেই দু ব্যাগ রক্ত জোগাড় করেছিলো। যদি ও এতো দ্রুত না তবু যথেষ্ট শক্তি যোগালো। তিনদিনে মোটামুটি সেরে উঠলো।
-মিশু।
-হুম? স্ক্রীনে তাকিয়ে থেকে বললো।
-আজ সেই রাত।
-কিসের?
-তোমার প্রস্তুত হওয়ার। নিচে সেলারে একজন ট্রেনার অপেক্ষা করছেন। তোমাকে কুংফু শেখানো হবে।
-সত্যি? আজ উত্থানের দিন।
-আজ উত্থানের রাত। এই রাত সেই রাত যে রাতে মহান মানুষটি লড়তে শুরু করেছে।
তিন.
প্রায় প্রতিটি মানুষের ভেতর প্রতিশোধের স্পৃহা থাকেই। সে একসময় না একসময় প্রতিশোধ নেবেই। এই প্রতিশোধের নেশাটা মানুষের ভেতর তুমুলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে যখন সে ভয়ংকরভভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আর এই প্রতিশোধের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় অনেক কিছুর।
মিশু জানতো না যে আজ যেটার জন্য সে প্রস্তুত হচ্ছে সেটা যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের করে ফেলবে। চাইনিজ মার্শাল আর্টের সাতটি শাখায় ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণে তাকে পারদর্শি করে তোলা হয়েছে। আজ এক সপ্তাহ ধরে সে নিঞ্জা, শাওলিন, উশু এসব বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেছে। শুধু তাকে এই প্রশিক্ষণেই ব্যস্ত রাখেননি বিজ্ঞানীর নিয়োগ করা প্রশিক্ষক। বরং ছুরি, চাকু, কুড়াল, দা, কাস্তে ও নিনজা তরবারির প্রশিক্ষণে সুদক্ষ করে তুলেছেন।
আজ সেই দিন। বহুল আকাংখিত দিন। মিশু যে প্রতিশোধের জন্য ঘুরছিলো। বিজ্ঞানী লোহার কারুকার্য খচিত একটা স্টার দিলেন।
-এটা কি?
-বুমেরাং স্টার।
-মানে মারলে ফেরত আসে?
-হ্যা। আর এই নাও তোমার ব্যাগ। যা কিছু দরকার সব এখানে। এবার ওয়ারলেস ইয়ারফোন আর স্যুটটা পরে নাও।
শিপলু এগিয়ে এসে একটা কাপড় দিলো।
-কি এটা?
-পড়ে নাও ভাইয়া। এটা স্কিন টাইট একটা মুখোশ। যাতে কেউ খুলে ফেলতে না পারে আ্যন্টি-প্রটেকশন সিস্টেম আছে। সুতরাং যতই মারামারি করো কোন লাভ নাই তাদের, যতক্ষণ না তোমাকে চিনতে পারছে।
ম্যাগহুক হাতে ছাদে উঠে গেলো মিশু। আলো আধারির মিরপুর তার বহিরাবণে শান্ত শীতল বাতাস বইয়ে দিচ্ছে বৈশাখ শেষের রাতে।
বিপ!
-তৈরি? সেন্ট্রাল কমান্ড থেকে বিজ্ঞানী। আ্যসিস্ট করছে তার ছেলে শিপলু। শিপলুরও জিপিএস ও ট্রেসিং এর ব্যাপক ধারণা রয়েছে।
-মিশু ভাইয়া তোমার ব্যাগের ভেতর দুই ডজন মাইক্রো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। ওগুলো প্রতিটি ব্লকের শুরু কিংবা শেষের ইলেক্ট্রিক পিলারের ভেতর লাগিয়ে দাও। প্রতিটা ক্যামেরার অটো ড্রিল সিস্টেম আছে। ওরা নিজ থেকেই আ্যডজাস্ট করে নেবে।
-ওকে।
সবকিছু লাগানো শেষ।
-মিশু। প্রতিটা ক্যামেরায় উচ্চ সংবেদনশীল সাউন্ড রিসিভিং সিস্টেম আছে। এর মানে হলো মিরপুর থেকে প্রতি সেকেন্ডে চার লাখেরও ভিন্ন শব্দ আমাদের কাছে আসছে।
-এক সেকেন্ড। শিপলুর কান খাড়া হয়ে গেলো কিছু অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনে। সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনো!
চার পাচ জন বলাবলি করছে।
-হালা যে ইশ্মারট পুলা। মারতে মন চায় নাই। কি করতাম? উস্তাদ কইছে ফালাই দিতে তাই ডাস্টবিনে ফালাই দিছি। তয় পোলাডা নাকি অনেক বুদ্ধি রাখতো মাথায়...
-শিপলু লোকেশনটা বলো প্লিজ। মন চাইতেছে এখনই ওদের মেরে আসি।
-না আ! মারা যাবে না! মিশু মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা করো। ওদের বেধে তারপর মুখ খোলাও কে করেছে এই কাজ।
-ওকে। শিপলু কোথায় ওদের আস্তানা আমাকে জানাও।
-তিন ব্লক পর, যেখানে দাঁড়িয়ে আছো সেখান থেকে। মিরপুর সাতে।
-যাচ্ছি।
চার.
-শিপলু। এটা একটা গোডাউন। অনেক বড়।
-তাহলে অনেক সাবধানে ঢুকো। এটা কোন ধরণের আস্তানা হতে পারে। আর একটা কথা। তোমার স্যুটের পেছনের দিকে ক্যামেরা অন করা। সুতরাং বিপদ যে পেছন থেকে আসবেনা তার গ্যারান্টি দিচ্ছি না। চোখ কান খোলা রাখো।
এক প্রস্থ দম নিয়ে গোডাউনের ভেতরে তাকালো। ভেতরটা পুরোপুরি অন্ধকার নয়। আবছা আলোয় যতটুকু বোঝা যায় সব যা আছে এখানে এক্সপোর্ট সম্পর্কিত কিছু। একটা বাক্সে হাত রাখলো। ভেতরে ঢুকাতেই মনে হলো টাকার অনেক গুলো বান্ডিল। হঠাৎ দুজন মানুষকে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো। আড়াল নিতেই একবারে কাছ দিয়ে চলে যাচ্ছিলো। ওরা একটু সামনে গিয়ে থামলো। কথা বলছে...
-আগামীকালকে ত্রিশ কার্টন হিরোইন আসবে। ভালোভাবে প্রিজার্ভ করবি। আর আজকে এই ডলার গুলো আমেরিকায় পাঠাতে হবে। নতুন পোকার খেলবে পার্টনার।
-ওকে বস।
এক মিনিট ভাবলো মিশু। এখন যদি পদক্ষেপ না নেয় তাহলে হয়তো সামনে আরো কিছু করাই কঠিন হয়ে যাবে। ফাকতালে গোডাউনের বাইরে এসে বিজ্ঞানীককে নক করলো।
-ওদের ডলারের খোজ পেয়েছি। ট্রাকের গায়ে আমার কাধের ক্যামেরাটা লাগিয়ে দিয়ে আসছি। শিপলু যেনো ট্র্যাক করে।
-একটু সাবধানে থেকো। বলা যায় না কখন কি হয়।
-আচ্ছা। হাসলো মিশু।
ট্রাকের গায়ে ক্যামেরাটা ফিট করে আড়াল নিলো আবার। হ্যাংলা মতন একটা ড্রাইভার আর ইয়া বিশাল জাম্বো সাইজের হেল্পারকে দেখা গেলো। ট্রাকের ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে তার ভেতরে গিয়ে বসলো। গাড়ি চালু করে রওনা হয়ে গেলো তারা।
-এখন?
-দেখতেসি কি হয়। কারো আসার শব্দ পাচ্ছি। আরে এরা কারা? কস্টিউম পড়া? দাঁড়ান একটু দেখি।
লাফ দিয়ে নিজেকে উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে আসলো মিশু। আগন্তুকদের সামনে এসে দাঁড়ালো। কুংফু স্টাইলে দাঁড়ালো। এইম নিলো।
-হা আ আ আ!
-দাড়াও। মেরো না ওকে। খুব গম্ভীর একটা কন্ঠ বলে উঠলো। এই ছেলে তোমাকে আমরা মারবো না।
-আপনারা কে? মুখ চেপে বলছে মিশু।
-আমি দস্তানা। এ বাজপাখি। আর ও চাবুকি।
-আপনারা কিছুদিন আগে নাবিলা শেহজাদকে বাঁচিয়েছেন? অবাক হয়ে মিশু বললো!
-হ্যা। কিন্তু তুমি কে?
-আমি মিশু। অন্য নাম রাতের প্রহরী।
বিজ্ঞানীর মুখ থমথমে। মিশু দশ মিনিট কোনো রেস্পন্স দিচ্ছে না। শিপলু কে ট্রেস করতে বললেন। শিপলু বললো মিশু তিনজনের সাথে কথা বলছে। স্যাটেলাইট ভিউতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
কিইইইইইইইচ করে নয়েজ সিগ্ন্যাল হলো ইয়ারফোনে।
-স্যার বলুন।
-ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আবার মিশুকে লাইনে পেয়ে স্বস্তিবোধ করলেন। "কার সাথে কথা বলছো?"
-উনারাও দক্ষিণ ঢাকা থেকে আসছেন আমার মতো এই দলের পেছনে লাগতে।
-কে উনারা? বিজ্ঞানী বললেন।
-নাবিলা শেহজাদের উদ্ধারকারী।
পাচ.
রাত তখনো তরুণ।
এক-দুটো ঝি ঝি পোকা বেতাল চিল্লিয়ে যাচ্ছে। কুকুরগুলো জেগে উঠতে শুরু করেছে। এরি ফাঁকেফাঁকে দারোয়ানেরা চক্কর দিচ্ছে বাড়িগুলো ঘিরে। কারো ছোট্ট বাড়িতে হয়তো দারোয়ান নেই।
এরই মাঝে মিরপুরে পৌছে গেছে এক দল মানুষ। এদের সবার পরিচয় এরা অন্যায় পছন্দ করে না। এরা রাত নামলেই বেরিয়ে পড়ে নির্দিষ্ট জায়গায় হামলা চালিয়ে শত্রুপক্ষের অবস্থান দুর্বল করে দিতে। তারা সবাই বিজ্ঞানীর বাড়িতে এসেছেন তাদের ভেতরের সকল বিষয় আলোচনা করতে।
-আপনি হাসমান ফরাজী! বিশ্বাসই হচ্ছে না। আর এই সেই ছেলে যে আকাশে ওড়ে! আর এর কোমরে বাধা রয়েছে ইলেকট্রিক ওয়্যারড চাবুক!
-আসলে উত্তর দক্ষিণ বলে কথা না। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের কোন কিছু যদি অন্যায়ের দিকে যায় সেটা প্রতিহত করা।
-তা তো বুজলাম। কিন্তু আপনারা যে এখানে এসেছেন তার কারণটা জানতে পারি?
-অদ্ভুত হলেও সত্যি, আমরা একটা ছোটখাটো ঝামেলার তদারক করতে গিয়ে বিশাল বড়ো প্যাঁচের সন্ধান পাই। বাজপাখি অর্থ্যাৎ আমার ছেলে আইমানের এক ক্লাসমেট জানায় যে তার বড়ভাইকে কারা যেনো মেরে বাম হাটুর অবস্থা বেগতিক করে দিয়েছে। এই সমস্যা সুরাহা করতে গিয়ে খোজ পাই যে ছেলেটি মেরেছে সে একটি ড্রাগ ডিলারের ছেলে। রাস্তায় গাড়ি পার্কিং নিয়ে সামান্য কথা কাটাকাটি হওয়ায় ছেলেটিকে লোকজন ডেকে মারে ড্রাগ ডিলারের ছেলে। এই ডিলার আবার এক ড্রাগলর্ডের দয়ায় সংসার চালায়। বিশাল বাহিনী তার। সেই ড্রাগলর্ডের আস্তানায় আজ এসেছিলাম ছেলেটার বাবাকে দেখতে।
-মানে টাক্কুর কথা বলছেন? আত্নবিশ্বাসের সাথে বললো মিশু।
-বাহ! এইতো জেনে গেছো।
হুম।
-তো এখন কি করবো? বিজ্ঞানী বললেন।
-আমার লক্ষ্য ওরা কেউ না। আমি মাদক মুক্ত করতে চাই এই সমাজকে। এই চেইনটাকে ভেংগে দিতে পারলে বোধহয় নতুন করে কেউ আক্রান্ত হবে না। তবে একেবারে গোড়ায় গরম পানি ঢালতে চাই। মানে নাটের গুরুটা কে তা দেখতে চাই। এরপর আস্তে আস্তে সমাজের অন্যদিক নিয়ে ভাবতে চাই।
-একটা দিক দিয়ে আমরা কমন কিন্তু।
-কোন দিক থেকে বলতে চান? বিজ্ঞানীর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন হাসমান। বার্ধক্যকে বিজ্ঞানের জোরে আটকে রাখা এই মাঝবয়সী ভদ্রলোক একটু অদ্ভুত চাউনি দিলেন।
-মিশুকে আমি শাহা্য্য করছি যাতে সে ড্রাগ ডিলারের উপর প্রতিশোধ নিতে পারে। আর আপনারা একই ব্যক্তির উপরের মাথাগুলিকে খুঁজছেন।
-আমরা খুজছি না। আমরা প্রতিটা ব্যক্তিকে সদলবলে নির্মূল করবো।
-আপনি কি বলতে চান? হত্যা করা যে মহাপাপ সেটা জানেন না? বিজ্ঞানী বিরক্তি সহকারে তাকালেন।
-আমি তো বলি নাই যে আমি ওদের মেরে ফেলবো।
-তাহলে?
-আমরা এমন একটা টক্সিন তৈরি করে ফেলেছি যা শত্রুকে পক্ষাঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
-কি এটা?
-আমারানথিন গ্যাস আর গেডোলিনিয়ামের কম্প্রেসড লিকুইড।
-ফর গড সেক আপনি কেমিকেল উইপন তৈরি করতে পারেন না!
-অদ্ভুত কথা শোনালেন। আমি ৭০ শতাংশ আ্যান্টি-ডোট দেই ৩০ শতাংশের বিপরীতে! আপনি যেটা মনে করতে পারেন।
-ওকে এইখানে আমি আপনাকে সাহায্য করবো কম বিষক্রিয়ার ডেভেলপমেন্ট এ।
-টিম আপ! মিশু উচ্ছ্বাসের সাথে জানালো।
ছয়.
"মিশু"
নীচ থেকে আলোর প্রতিফলন ছাদের উপর চারপাশে এক ধরণের আলোছায়ার খেলায় মেতে উঠেছে। শহরের ওপাশ থেকে বাতিগুলোর সারি যেনো সূর্যগুচ্ছ হয়ে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। মিরপুরের কোন এক বিল্ডিং এর ছাদের উপর দাড়িয়ে আছে মিশু- রাতের প্রহরী।
-ইয়েস স্যার।
-একটা ড্রোন উড়ছে তোমার আশে পাশে। আমার কোম্পানির আ্যাপ্লায়েড সায়েন্স ডিভিশনে তৈরি এটা। নাম 'ডোংগা'। চারপাশে ৩৬০ ডিগ্রিতে ঘুরে এটা তোমার পেছন পেছন যাবে। ইনফ্রারেড সিস্টেম আছে এটার। সুতরাং বুঝতেই পারছো কেমন ছবি তুলতে পারে ঘুটঘুটে অন্ধকারে?
-হুম।
খানিক আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। মিশু যেখানে দাড়িয়ে আছে সেখান থেকে ড্রাগলর্ডদের গোডাউন মাত্র দেড়শ গজ। একটু পিছিয়ে এলো সে। ভর ছেড়ে দিয়ে ম্যাগহুক এ শরীরটা ছেড়ে দিয়ে নেমে এলো মাটিতে। ধুপ!
বিশাল বড় গোডাউন। ফাক হয়ে থাকা একটা দরজা দিয়ে ঢুকলো রাতের প্রহরী মিশু। কার্গো ট্রেইলার এর সারি। একটার পর একটা। মাঝখানে একটা সরু পথ। একটা নয়। ক্রস করে দুইটা পথ তৈরি করে রাখা হয়েছে। চার দিক থেকে গোডাউনের মাঝখানে এসে পথ দুটো মিলিত হয়েছে। চোখ সতর্ক রেখে আস্তে আস্তে একটা ট্রেইলারের উপরে দাঁড়ালো। চারটা পয়েন্টে চোখ ঘোরালো। একদিক থেকে আলো আসছে। সেদিকে পা বাড়ালো।
-মিশু! বিজ্ঞানীর কন্ঠ গম্ভীর শোনালো।
-হুম বলেন।
-খারাপ খবর আছে।
-কি?
-গতকাল তুমি যে ট্রাকের পেছনে ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়েছো ওটার কিছু ভিডিও ফুটেজ আমার কাছে এসেছে।
-কিছু পেয়েছেন?
-হ্যা।
-চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় কিছু মেয়েকে তুলে নিয়েছে। ঢাকার ফকিরাপুল থেকে। মনে হচ্ছে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের।
-আচ্ছা?
-আচ করতে পারলাম এরা তোমার লোকেশনেই আসছে।
-আ্য?
চিউ!
সাইলেন্সার পিস্তলের গুলি কানের পাশ দিয়ে গেলো। বুঝতে পারলো মিশু কতোব্বড়ো বোকার মতো কাজটা করেছে সে। ডাইভ দিয়ে নিচু হয়ে বিড়ালের মতো ঝাপ দিয়ে আড়াল নিলো। আরেকটা ঠাং আওয়াজ হলো। ঠুং!
ব্যপার কি?! আন্দাজে গুলি করছে নাতো? দু মিনিট সময় নিয়ে ভাজ মেরে পড়ে থাকলো। পায়ের খচখচ আওয়াজ আসলো। যতো সময় গড়াচ্ছে ততো আওয়াজটা কাছে আসছে! আর সহ্য করতে পারছিলো না দেখে লাফ দিয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ঘুষি মারতে উদ্যত হলো। আরে একি চাবুকি?
-আরে জাইমা তুমি এখানে কেনো?
-তোমার বিপদ হবে ভেবেই আমি চলে এসেছি।
-তোমার হেডসেট কই?!
-অন করা বাবা লাইনে আছেন।
-বাচালে। ফিক করে হেসে দিলো মিশু। আবছা আলোয় জাইমাকে অসাধারণ দেখাচ্ছে। গতকাল খেয়াল করেনি।
-আ্যই! জাইমা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে ফেললো।
-কি? মুখে আংগুল চাপা দিয়ে জাইমাকে বোঝালো। মোবাইল অন করে নাম্বার টাইপ করতে বললো। জাইমা সেভ করে দিলো।
-উ উ! হাত বাড়িয়ে জাইমার ফোন চাইলো।
-উ হু! না দেবার ভংগিতে বোঝালো মিশুকে যে সে আগে কল দিবে।
-তোমার পেছনে!
ঘুরে না দাঁড়িয়েই জাইমা কষে লাথি লাগালো আগন্তুককে। ছিটকে দুহাত পেছনে পড়লো না। বরং শক্ত হয়েই দাঁড়িয়েই রইলো।
-জাইমা পেছনে যাও। আমি দেখছি। মিশু হাত দুটো শক্ত করে ফেললো। বুঝলো তাদের প্রতিপক্ষ মোটেই কোন সাধারণ মারকুটে গুন্ডা নয়।
-মিশু! আমরা চারপাশ থেকে আটকে গেছি। দেখো। মুখ কালো হয়ে গেছে জাইমার।
চারপাশ থেকে মানুষ আসছে। ড্রাগ ডিলারের মানুষ এরা!
সাত.
-জাইমা পজিশন নাও।
-ওকে।
যতো মার্শাল আর্টের কৌশল আছে সবকিছু প্রয়োগ করলো মিশু। এদের কেউ কেউ ভালো কৌশল রপ্ত করেছে। কুলিয়ে উঠতে পারছে না মিশু। সংখ্যায় অনেক। জাইমা তার চাবুক নিয়ে টপাটপ কয়েকটাকে ধরাশায়ী করে ফেললেও কিছু দক্ষ মানুষের কারণে আক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না।
-ওয়েল ওয়েল। একবার হাত তালি দেয়া হলো। গম্ভীর কন্ঠ। এ পরিবেশে বড়ই বেমানান। "ভালো মারকুটে এই এলাকায় আছে জানতে পেরে খুশি হয়েছি। কিন্তু আজ এদের শেষ দিন। আতাতায়ী সংঘের ইতিহাসে এদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।"
-আতাতায়ী সংঘ?! এই যে আপনি কে? আপনাকে তো চিনলাম না।
-রিফাত শেখকে চেনেনা, এমন খুব কম মানুষ আছে যারা মাফিয়া দুনিয়া নিয়ে গবেষণা করে।
-দু:খিত জনাব, আমরা সাধারণ দুনিয়ার মানুষ। আপনার মতো মহামানবকে আমরা কেমন করে চিনবো?
-খামোশ! এদের দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করে দাও।
রিফাত বিদায় নেয়ার পর বহুগুণে বেড়ে গেলো তার লোকজন। গোটা গোডাউনে পিল পিল করে মানুষ ঢুকছে। এতো বেশি পরিমাণে, যে কখন তারা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে, মিশু বুঝতে পারেনি।
-জাইমা!
-মিশু, এটাই বোধহয় আমাদের শেষকথা।
-আমার শেষ কথা আমি তোমাকে পছন্দ করি, জাইমা!
চোখ বন্ধ করে ফেলেছে জাইমা, হঠাৎ মিশুর একটা কথায় চোখ খুলে গেলো।
-আরিব্বাস! এযে রানার!
-তাইতো! আরে কপিমাস্টারও দেখি!
কোথা থেকে উদয় হলো আল্লাহ মালুম। দুই হাত মুঠো একটা গোটা রোবটের মতো দেখতে মানুষ উড়ে এলো যেনো। এক লাইনে সব মানুষকে সাফ করে দিলেন।
-যন্ত্রমানব!
ওদিকে রানার এতো দ্রুতগতিতে দৌড়ে এতো জোরে আঘাত করছে আতাতায়ীদের, কেউ বেচে আছে কিনা বোঝার জো থাকলো না।
হঠাৎ মাটি কড়কড় করে উঠলো। একটা বিশালাকারের মানব আকৃতির মাটির দলা যেনো মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো। একে একে অনেক নতুন চেহারা দেখা গেলো। আতাতায়ীদের বেশিরভাগই পালিয়ে যাচ্ছে। একে একে সবাইকে পরাস্ত করে ফেলা হলো। যারা একটু আগে মিশু আর জাইমাকে চক্রের ভেতর ফেলবার চেষ্টা করেছিলো তারাই ধরা খেয়ে গেলো।
-আপনারা? সবার পেছন থেকে বলে উঠলেন দস্তানা। সাথে বাজ।
-ওহ! আপনিই সেই গ্লোভ? আমি ম্যাকাপ এজেন্ট শান্ত।
-বললে ভালো হবে আপনি বিখ্যাত যন্ত্রমানব।
-হাহাহা। আগে থেকেই এদের গতিবিধি লক্ষ করছিলাম। এরা, মানে আতাতায়ী সংঘ বিশাল চক্রান্ত করছে স্যাবোটাজ করার জন্য।
-তাই, কমন শত্রু দেখছি। গম্ভীর কন্ঠ হাসমানের।
-আমরা চাই আপনারাও আমাদের সাথে যোগ দিন।
-কোথায়?
-ম্যাকাপে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যতো বড়ো ষড়যন্ত্র আছে তার বিরুদ্ধে লড়বো আমরা একসাথে।
-আচ্ছা। আমরা আছি।
ম্যাকাপ তার পরিপূর্ণতা পেলো-দস্তানা, রাতের প্রহরী, চাবুকি ও বাজপাখি এই চারজনকে দিয়ে। তবে এই গল্পের শেষ নয়, গল্পতো শুরু হলো মাত্র। আবার হয়ত তারা ফিরে আসবে।
